জেলা পরিষদের প্রকৌশলীর তেলেসমাতি, কুলাউড়ায় সরকারি রাস্তা বাদ দিয়ে ব্যক্তিগত রাস্তায় কাজ

কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধিঃ মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নে জেলা পরিষদের প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থে একটি রাস্তায় ইটসলিং কাজ নিয়ে ধুম্রজাল তৈরি হয়েছে। প্রকল্পে স্থান নির্ধারত করতে দু’পক্ষের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। উল্লেখিত প্রকল্পে সরকারি রাস্তা বাদ দিয়ে মৌখিকভাবে পরিবর্তন করে ব্যক্তিগত বাড়ির রাস্তা করে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী মো. শামছুল আলম।

এ নিয়ে হাজিপুর ইউনিয়নের মাতাবপুর ও মনু বাজার এলাকার জনসাধারণের মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।

সম্প্রতি জেলা পরিষদের প্রকৌশলী শামছুল আলম হাজিপুর ইউনিয়নের মনু বাজারের ধর্নাঢ্য রাজনৈতিক ব্যক্তি ফারুক আহমদ পান্নার আত্মীয় উক্ত কাজের ঠিকাদারকে নিয়ে ওই বাড়িতে গিয়ে দাওয়াত খান। সেখানে জেলা পরিষদ থেকে বরাদ্ধকৃত প্রকল্পে সরকারি রাস্তার কাজ বাদ দিয়ে ব্যক্তিগত রাস্তা করে দেবার জন্য মোটা অংকের আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে গুঞ্জন রয়েছে।

সরেজমিন এলাকায় গিয়ে জানা যায়, হাজীপুর ইউনিয়নের মাতাবপুর রবিদাস বাড়ি থেকে পলক নদী পর্যন্ত একটি সরকারি রাস্তা রয়েছে। এই রাস্তা দিয়ে ৪০ টি রবিদাস পরিবারসহ প্রায় দেড় শতাধিক পরিবারের লোকজনসহ তুকলি মাতাবপুর গ্রামের লোকজন কৃষিকাজের জন্য ধানি জমি ও পলক নদীতে নিয়মিত যাতায়াত করেন। বর্ষা মৌসুমে একটু বৃষ্টি হলেই এই রাস্তাটি কর্দমাক্ত হয়ে যায়।

এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ে রবিদাসসহ অন্যান্য পরিবাররা। রবিদাস পরিবারের লোকজন মৃত ব্যক্তির লাশ সৎকার করার জন্য পলক নদীতে লাশ নিয়ে যেতে পারেন না। এমন সমস্যার বিষয়টি রবিদাসরা একাধিকবার ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল বাছিত বাচ্চুকে জানালে জনগনের কষ্ট ও ভোগান্তির কথা চিন্তা করে চেয়ারম্যান বাচ্চু মাতাবপুর রবিদাস বাড়ি থেকে মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত রাস্তাটি ইট সলিং করার জন্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে এই রাস্তা ইট সলিং করার জন্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ২০১৯-২০ অর্থ বছরে এক লক্ষ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেন।

গত ১১ জুলাই শনিবার রাস্তাটির কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তুু স্থানীয়ভাবে কাজের স্থান নির্ধারণ নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা দেওয়ায় এখনো কাজ শুরু হয়নি।

স্থানীয় মাতাবপুর এলাকার তবারক আলী, মোমিন আলী, সুন্দর আলী, ফররুখ মিয়া, ঝুনুরসহ অনেকেই জানান, ৯ জুলাই বৃহস্পতিবার জেলা পরিষদের ইঞ্জিনিয়ার ও ঠিকাদার শামীম আহমদ আকস্মিক ভাবে স্থানীয় বিএনপি নেতা ফারুক আহমদ পান্নার বাড়িতে গিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন।

পরদিন জানান নির্ধারিত রাস্তায় কাজ না করে তিনি উক্ত রাজনৈতিক নেতার বাড়িতে যাওয়ার জন্য ব্যক্তিগত রাস্তায় কাজ করবেন। এতে মাতাবপুর এলাকার রবিদাস পরিবারসহ অন্যান্য লোকজন তীব্র ক্ষোভে ফুঁসে উঠে।

এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি হাজী আকবর আলী জানান, রবিদাস বাড়ি থেমে পলক নদী পর্যন্ত রাস্তাটি সরকারি। অপর দিকে পান্নার বাড়ির লোকজন যাতায়াত করেন সাবেক চেয়ারম্যান সত্য বাবু, সাবেক মেম্বার আতাউর রহমান কুদ্দুস, মাতাবপুর গ্রামের এবাদ উল্ল্যাসহ কয়েক মালিকের ব্যক্তিগত
জমির উপর দিয়ে। তুকলি মাতাবপুর গ্রামের সর্দার আব্দুস সোবহান জানান, সরকারি রাস্তা বাদ দিয়ে কোনো ব্যক্তির মালিকানাধীন জমিতে সরকারি টাকায় রাস্তা করা হলে জনগণ মেনে নেবে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাজীপুর ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল বাছিত বাচ্চু জানান, রবিদাস পরিবারসহ এলাকার লোকজনের ভোগান্তির কথা চিন্তা করে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বরাবরে রাস্তাটি ইট সলিং করার জন্য আবেদন করি। বরাদ্দ দেওয়া টেন্ডার আহবান সবই ঠিক আছে। কিন্তু হঠাৎ করে জেলা
পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী শামছুল আলম কোন স্বার্থে শতাধিক পরিবারের কথা চিন্তা না করে প্রকল্প নির্ধারিত মাতাবপুর গ্রাম ছেড়ে পাশ্ববর্তী মনুবাজারে গিয়ে কয়েক পরিবারের বাড়ির ব্যক্তিগত রাস্তা করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন তা আমার বোধগম্য নয়। এ নিয়ে এলাকায় যে কোন
অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি ঘটলে তার দায় কিন্তুু তাকেই বহন করতে হবে।

জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী মো. শামছুল আলম মুঠোফোনে বলেন, জেলা পরিষদ থেকে হাজিপুর ইউনিয়নের মাতাবপুরে রবিদাস বাড়ি থেকে ইকবাল মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা ইট সলিংয়ের জন্য যে প্রকল্প পাশ হয়েছে সেখানে বাস্তবে কাজের সাথে কোন মিল নেই, তাই আমি কাজ করবো না। প্রকল্পমতে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান যে রাস্তা দেখিয়েছেন সেটা ইতিমধ্যে এলজিএসপি থেকে করা হয়েছে। কাজের বাকি অংশটুকুও এলজিএসপি করবে, জেলা পরিষদ করবে না। তাই মনু বাজারের ওই রাস্তাটি
খালি থাকায় ব্যক্তিগতভাবে একজনের হলেও ডাকঘরের বিবেচনায় রাস্তাটি করার সুযোগ আছে।

সরেজমিন রাস্তা দেখতে এসে বাধাগ্রস্থ হয়েছি। কাজ করতে আমার ব্যক্তিগত কোন এখতিয়ার নেই, কাজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে জেলা পরিষদ। স্থানীয়ভাবে জেলা পরিষদের কাজে একমাত্র জেলা পরিষদের সদস্য নাক গলাতে পারবে, ইউনিয়ন চেয়ারম্যান কেন নাক গলাবেন। এদিকে স্থানীয় ধর্নাঢ্য রাজনৈতিক নেতার বাড়িতে রুদ্ধধার বৈঠক কিংবা আর্থিক লেনদেনের বিষয় জানতে চাইলে তিনি এসব বিষয়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম ফরহাদ চৌধুরী বলেন, বিষয়টি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আমাকে অবগত করেছেন। শুনেছি এলাকায় জেলা পরিষদের প্রকল্পে রাস্তার ইটসলিং কাজ নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহোদয়ের সাথে কথা বলেছি। সরেজমিন রাস্তা দেখতে যাবো। বর্তমানে বিষয়টি সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত কাজ শুরু না করার জন্য জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা স্যারকে অনুরোধ করেছি।

রাজনীতি/কাসেম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here