ডাক্তার হয়ে গ্রামের মানুষকে সেবা করতে চান মিশোরী মুনমুন

মাহবুবুর রহমান প্রকাশিত : ৬ জুলাই ২০২১

বাবা বেসরকারি কোম্পানিতে ছোট্ট একটি চাকরি করেন, মা গৃহিণী। তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট তিনি। এমন একটি পরিবার থেকে মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় সারাদেশের মধ্যে প্রথম হয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন পাবনার মিশোরী মুনমুন।

২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে এমবিবিএস প্রথম বর্ষে ভর্তি পরীক্ষায় চার হাজার ৩৫০ জন ভর্তিচ্ছু নির্বাচিতের মধ্যে সবাইকে টপকে মেধা তালিকায় প্রথম হয়েছেন পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের এ শিক্ষার্থী। ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় মিশোরী পেয়েছেন ৮৭ দশমিক ২৫। তার মোট প্রাপ্ত নম্বর ২৮৭.২৫। ভর্তি পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে শিক্ষক, বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজন সবার প্রশংসায় ভাসছেন তিনি। গত ২ এপ্রিল তিনি পাবনা মেডিকেল কলেজ কেন্দ্র থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন।

মুনমুনদের বাড়ি পাবনা শহরের রাধানগর মহল্লার নারায়ণপুরে। তাঁর বাবা মো. আব্দুল কাইয়ুম স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজে শ্রমিকের (প্রোডাকশান হেল্পার পদে) কাজ করেন। মা মুসলিমা খাতুন গৃহিণী। মুনমুনের বড় বোন চিকিৎসক। তিনি চুয়াডাঙ্গায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। মেজো বোন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে রসায়ন বিভাগে স্নাতক (সম্মান) শেষ বর্ষে পড়ছেন। আসুন জেনে নেই মিশোরী মুনমুনের সফলতার গল্প:

বেড়ে ওঠা

পাবনা শহরের রাধানগর মহল্লার নারায়ণপুর এলাকার ইসামতি প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ে একাডেমিক পড়ালেখার হাতে খড়ি মিশোরী মুনমুনের। সেখানে দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা শেষ করে তৃতীয় শ্রেণী থেকে এসএসসি পর্যন্ত পাবনা সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেন। সেখান থেকে ২০১৮ সালে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি এবং ২০২০ সালে সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি পাস করেন মিশোরী মুনমুন।

দৈনিক রাজনীতি: মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হওয়ায় আপনার অনুভূতি কী?

মিশরী মুনমন: আলহামদুলিল্লাহ। এটি আসলে বলে বোঝানোর মতো না। যখন খবরটি পেলাম সেই মুহূর্তটা একেবারেই অন্যরকম অনুভূতি জোগায়। সব থেকে যে বিষয়টি আমার শিহরণ দিয়েছে সেটি হচ্ছে, ওই মুহূর্তে আমার পরিবারের সবাই এক সাথে কেঁদে দিয়েছে। ওই মুহূর্তটা আমার চোখের সামনে সবসময় ভেসে থাকে। আমি, আমার পরিবার, শিক্ষক, প্রতিবেশী স্বজনসহ সবাই অনেক খুশি।

দৈনিক রাজনীতি: চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন কখন থেকে?

মিশরী মুনমন: ছোট বেলা থেকে এটাই স্বপ্ন ছিল যে, ইনশা’আল্লাহ একদিন ডাক্তার হবো। একটা ছোট মানুষের যেমন স্বপ্ন থাকে আামারও তেমনি ছিল। আম্মু-আব্বুও তেমন স্বপ্নই দেখিয়েছে। এরপর যখন বুঝতে শিখলাম, তখন মনে হলো আমি কেন এই স্বপ্ন দেখছি এবং কেন আমি মেডিকেলে যেতে চাই? নিজের কাছে যখন জানতে চেয়েছি এবং সময় দিয়েছি, তখন বুঝতে পারলাম যে মেডিকেলে গিয়ে আমি কিছু করতে পারবো। শুধু আমার বা আমার পরিবারের জন্যই না বরং আমার এলাকার মানুষের জন্যও কিছু করতে পারবো।

দৈনিক রাজনীতি: আগামী দিনের স্বপ্ন বা ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী?

মিশরী মুনমন: ভবিষ্যতে যে আমি হবো সেই তুলনায় আমি এখনও অনেক ছোট। ভবিষ্যতে আমার স্বপ্ন ইনশা’আল্লাহ আরও ভালো হবে, আরও ইক্সপান্ড হবে।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। দেশে অনেক উন্নয়ন হচ্ছে। আমি চাই, সেই উন্নয়নের ধারায় নিজেকে সম্পৃক্ত করতে। আমি সব সময় চাই, আমার নিজের এলাকায় মেডিকেল ফোকাস আসুক। ফোকাস শুধুমাত্র ঢাকা কেন্দ্রিক না হয়ে আমার এলাকায় আনতে চাই, যাতে তারাও স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে।

বড় বড় ডাক্তাররাও শহর কেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা করে থাকেন। শহরেই তাঁরা থেকে যান, মাঝে মাঝে গ্রামে এসে চিকিৎসা দিয়ে যান। ফলে মফস্বলের মানুষ বঞ্চিত থেকে যায়। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নের এটি একটি কারণ। আর একটি বড় কারণ হচ্ছে লকডাউন। কারণ লকডাউন পরিস্থিতিতে প্রতিটি এলাকা পৃথক ও চলাচল সীমিত হয়ে যায়। তখন আমার এলাকা যদি সেবা এবং অন্যান্য দিক দিয়ে সয়ংসম্পূর্ণ থাকে তাহলে আমরা সেফটি ফিল করবো, সেইফ বলয় তৈরি হবে। তখন আমি গর্বিত হবো এই ভেবে যে এরা আমার নিজের এলাকার লোক।

দৈনিক রাজনীতি: ভবিষ্যতে কোন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হতে চান?

মিশরী মুনমুন: এ বিষয়ে আমি এখনও ভাবিনি। এখন আমার একটা নির্দিষ্ট ইচ্ছা থাকতে পারে, তবে পরবর্তীতে সেটা বাস্তবতার সাথে নাও মিলতে পারে। আসলে আমি তো মাত্র মেডিকেলে পড়ার সুযোগ পেলাম। যেহেতু আমি এখনও মেডিকেলে পড়ালেখা পুরোপুরি শুরু করিনি, কোন বিভাগ কেমন, কোন বিভাগে আমি ভালো করতে পারবো তা তো এখনও জানি না। যে বিষয়ে ভালো পারবো সে বিষয় নিয়েই পরবর্তীতে চিন্তা করবো।

দৈনিক রাজনীতি: মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সাফল্যের যে ধারাবাহিকতা তা অনেকে ধরে রাখতে পারে না। আপনার কি মনে হয়?

মিশরী মুনমুন: মেডিকেলে যারা উত্তীর্ণ হয়েছেন বিশেষ করে ঢাকা মেডিকেলে যারা পড়ছেন তারা কোনও না কোনও এলাকায় প্রথম। তারা সবাই মেধাবী। সবারই সেই যোগ্যতা রয়েছে বলেই সেই স্থান অধিকার করেছে। ধারাবহিকতা ধরে রাখার বিষয়টি ভিন্ন। কেননা একেকজনের জীবন একেকরকম, প্রতিকূলতাও একেকরকম। সেই প্রতিকূলতা অনেকেই টপকাতে পারে আনেকে পারে না। ইনশা’আল্লাহ আমি সেই ধারাবাহিতা ধরে রাখার জন্য প্রত্যয়ী।

দৈনিক রাজনীতি: আপনার সাফল্যের নেপথ্যে কী ছিল বা সফলতার পেছনে কার অবদান বেশি?

মিশরী মুনমন: অবদানের ক্ষেত্রে প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় এমন ক্রমানুসরে বলা যাবে না। সবাই আমার জীবনে অবদান রেখেছেন। তবে আমার অন্যতম অনুপ্রেরণা মা–বাবা। সর্বক্ষণ তাঁরা আমার খেয়াল রেখেছেন, উৎসাহ দিয়েছেন। এ ছাড়া আমার কলেজের শিক্ষক, গৃহশিক্ষকসহ সবাই আমাকে সহযোগিতা করেছেন, সাহস দিয়েছেন। এটাই অনুপ্রেরণা ছিল।

বলতে গেলে ছোট বেলা থেকে সবারই স্বপ্ন থাকে। কিন্তু নির্দিষ্ট একটি বড় স্বপ্ন দেখার ক্ষেত্রে আমার শিক্ষকরাই আমাকে সেই সুযোগ করে দিয়েছেন। তারাই আমাকে বারবার উৎসাহিত করেছেন। তারা সব সময় আমাকে বলতেন, তুমি অবশ্যই পারবে। ফলে পরিশ্রম করার আকাঙ্ক্খা সেখান থেকেই আমার মাঝে তৈরি হয়েছে। বলতে গেলে সবাই আমার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সর্বোপরি বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর দেশে জন্মেছি সে জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আর সবই আল্লাহর রহমত। পুরোটাই আল্লাহর অনুগ্রহ।

দৈনিক রাজনীতি: ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি কেমন ছিল?

মিশরী মুনমন: ইন্টারমিডিয়েটে যখন পড়ি মূলত তখন থেকেই শিক্ষকরা আমাকে মেডিকেলের জন্য প্রস্তুতি নিতে উৎসাহিত করতেন। তখন থেকেই মূল বইটা বুঝে পড়ার প্রতি লক্ষ্য নির্ধারণ করি। কারণ এইচএসসিতে বেইজ ভালো না থাকলে পরবর্তীতে ভর্তি প্রস্তুতির সময় অনেক বেশি খাটনি করতে হয়। ফলে ইন্টারমিডিয়েট থেকে একটু একটু করে প্রস্তুতি নিলে ভর্তি প্রস্তুতির সময় কিছুটা কষ্ট কমে যায়। শিক্ষকসহ, অন্যান্য যারা সিনিয়র রয়েছেন তাদের কাছ থেকে সাজেশনের মাধ্যমে প্রস্তুতি নিয়েছি। মূল বইটা ভালো করে পড়েছি, এর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রশ্নব্যাংক সমাধান করেছি। প্রশ্ন ব্যাংক সমাধান করার সময় নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয় এই ভেবে যে, এই ধরনের প্রশ্নগুলো আসলে অবশ্যই আমি পারবো।

দৈনিক রাজনীতি: অবসরে কি করতে ভালো লাগে?

মিশরী মুনমন: লেখালেখির পাশাপাশি বই পড়তে আমার ভালো লাগে। মূলত আমার ইসলামি বই পড়তেই ভালো লাগে। আর ভালো বই পেলেই পড়ি।

দৈনিক রাজনীতি: সময় দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।

মিশরী মুনমুন: আপনাকেও ধন্যবাদ।

রাজনীতি/জেএস

আপনার মতামত লিখুন :