ভুল চিকিৎসায় মা হওয়া থেকে বিঞ্চিত গৃহবধূ নাসরিন

গৃহবধূ নাসরিন বেগম।

নিজস্ব প্রতিবেদক, দিনাজপুর: বয়স সবে মাত্র ২৫ পুরলো নাসরিন বেগমের। পারিবারিকভাবে তৌহিদুল ইসলামর বিয়ে হয় গত ৬/৭ বছর আগে। এই সময় পরিবার স্বামী-শ্বশুড়-শ্বাশুড়ী নিয়ে ভালোভাবে জীবন কাটানোর কথা। কিন্তু ৪ বছর পূর্বে পুত্র সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে ডাক্তারের একটি ভুলের কারণে আজ তিনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন। এই বয়সের পরিবার সামলানোর কথা থাকলেও আজ স্বামী, শ্বশুর ও শাশুড়িকেই সামলাতে হচ্ছে নাসরিনকে। চিকিৎসকের একটি ভুলের কারণে তিনি সন্তানের মা হওয়া থেকে বিঞ্চিত হওয়ার পথে। চিকিৎসকের খামখেয়ালীর কারণে তৌহিদুলের পরিবারের কান্নায় গোটা গ্রাম কাঁদছে। তৌহিদুল ইসলাম ভ্যানে করে বিস্কুট, পাউরুটি, দোকানে দোকানে বিক্রি করে সংসারের খরচ চালবে না, মৃত্যু পথের পথযাত্রী একমাত্র চার বছর বয়সী অযুঝ শিশুর জননী নাসরিনকে চিকিৎসার খরচ যোগাবে।

বলছিলাম দিনাজপুর জেলার খানসামা উপজেলার আঙ্গারপাড়া (কসাইপাড়া) মোঃ তহিদুল ইসলামের স্ত্রী নাসরিন বেগমের কথা।

নাসরিন বেগমের স্বামী তহিদুল ইসলাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, বছর ৬/৭ বছর পূর্বে নাসরিন বেগমের সাথে তার পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। ২০১৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি গর্ভবর্তী নাসরিন বেগমকে খানসামা উপজেলার পাকেরহাটে লাইফ কেয়ার ক্লিনিকে সিজার করানোর জন্য নিয়ে যান। সেখানে খানাসামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সহকারী সার্জন ডা. শামসুদ্দোহা মুকুল সিজার করেন। সিজার করার ৬ দিন পর্যন্ত সেই ক্লিনিকে চলে নাসরিন বেগমের চিকিৎসা। চিকিৎসা শেষে তাকে বাড়ি নিয়ে গেলে গৃহবধূ নাসরিন বেগমের অবস্থার অবনতি হতে থাকে।

তিনি জানান, শিশু জন্মের ৮ম দিন আবারও সেই ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয় গৃহবধূ নাসরিন বেগমকে। সেখানে আবারও করা হয় তার অস্ত্রপচার। সেখানকার কর্তব্যরত নার্সরা তাকে জানান, সিজার করার জন্য চিকিৎসক ভুল বশত রোগীর পেটের ভিতর তুলা ও গজ রেখে দিয়েছিলেন। তা অপারেশনের মাধ্যমে বের করা হয়। কিন্তু সেই অপারেশনের পর থেকে রোগী আর সুস্থ্য হতে পারেনি। রংপুর, দিনাজপুর, চিরিরবন্দর উপজেলার রানীরবন্দরে অসংখ্য গাইনী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হলেও তিনি আর সুস্থ্য হতে পারেননি। সর্বশেষ চলতি মাসে দিনাজপুর ইসলামী ব্যাংক কমিউনিটি হাসপাতালের গাইনী বিশেষজ্ঞ ডাঃ মেহেবুন নাহার মিনুর কাছে নিয়ে যাওয়া হয় গৃহবধূকে। তিনি আগামী ৩ মাসের জন্য ওষুধ দিয়েছেন।

তিনি আরও জানান, মানুষের কাছে সুদের উপর ১৫ হাজার নিয়ে গৃহবধূর সিজার করেছিলাম। সেই সুদের টাকা প্রতিদিন হাজারে ১০ টাকা করে ১৫০ টাকা দিতে হয়েছে। সেই টাকা পরিশোধ করতে না পারায় আজ সেই টাকা লাভ সহ দাড়িয়েছে ৪০ হাজার টাকায়। এছাড়াও স্ত্রীর চিকিৎসা করতে গিয়ে গ্রামে আমার অনেক ধার নিতে হয়েছে। এখন মানুষ আমাকে ধারও দিতে চায় না। ভ্যানে করে গ্রামের বিভিন্ন দোকানে ও চায়ের হোটেলে বিস্কুট-পাউরুটি বিক্রি করে কোনমতে সংসার চালাচ্ছি। এর মধ্যে স্ত্রীর চিকিৎসাও করতে হচ্ছে।

অপরদিকে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলা ও সাক্ষাৎকার দেওয়ায় দিনাজপুর জেলার খানসামা উপজেলার আঙ্গারপাড়া (কসাইপাড়া) মোঃ তহিদুল ইসলামকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেকে পাঠান ডা. শামসুদ্দোহা মুকুল। তহিদুল ইসলাম জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ডা. মুকুল লোক পাঠিয়ে আমাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসতে বলে। সেখানে গেলে আমি হাসপাতালের দোতালায় নিয়ে ডা. মুকুল অকথ্য ভাষায় গালিগালা করে। আমাকে বলেন, তোর বেটা এত বড় সাহস হইছে যে, তুই সাংবাদিকদের সাথে আমার বিরুদ্ধে কথা বলবি। ডা. মুকুল আমাকে থানা পুলিশের ভয় দেখাচ্ছে। আমি তো এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।

গৃহবধূ নাসরিন বেগমের মা তহমিনা বেগম জানান, দিনাজপুরে ইসলামী হাসপাতালের চিকিৎসক বলেছেন ৩ মাসের মধ্যে ওষুধ খেয়ে যদি রোগী সুস্থ্য না হয় তাহলে রোগীর জরায়ু কেটে ফেলতে হবে। নইলে জরায়ুতে ক্যান্সার হবে। ভবিষ্যতে রোগীকে বাচানো সম্ভব হবে না। চিকিৎসক আমাকে জানিয়েছেন যে, প্রথমে রোগীর সিজার করার জন্য ইনফেকশন হয়েছে। সেই ইনফেকশন তার জরায়ু পর্যন্ত চলে গেছে। এখন তো আমরা রোগীকে নিয়ে চরম বেকায়দায় পড়ে গেছি।

গৃহবধূ নাসরিন বেগমের শাশুড়ি জিন্নাহ বেগম জানান, ছেলেকে বিয়ে দিয়েছি যাতে করে সংসারের হাল ছেলের বউয়ের উপর ছেড়ে দিতে পারি। আমার বয়স হয়ে গেছে। আমার বিশ্রামের প্রয়োজন। কিন্তু আমি কি বিশ্রাম নিব, উল্টো এখন সংসারের সাথে ছেলের বউকে সামলাতে হচ্ছে। ছেলের বউ একা চলতে পারে না, সার্বক্ষনিক তার কাছে একজনকে থাকতে হয়। আমি তাকে সামলাবো না সংসার সামলাবো। খুব কষ্ট লাগে ছেলের বউটাকে দেখে। এই বয়সে ৪ বছর ধরে বিছানায় শুয়ে কষ্ট সহ্য করছে। ডাক্তারের ছোট একটা ভুলের কারণে আজ মেয়েটার এই অবস্থা। ডাক্তার যদি এই ভুল না করতো তাহলে আজ আমি বিশ্রাম করতাম আর ছেলের বউ সংসারের হাল ধরতো।

খানসামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক কয়েকজন চিকিৎসক জানান, ২০১৬ সালে যোগদান করা সহকারী সার্জন ডা. শামসুদ্দোহা মুকুলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। তিনি সহকারী সার্জন হয়েও পাকেরহাটে অবস্থিত লাইফ কেয়ার ক্লিনিকে নিয়মিত গাইনী চিকিৎসা দিচ্ছেন। এছাড়াও ঠাকুরগাঁও জেলার স্বদেশ ক্লিনিকে তিনি প্রতি বৃহস্পতিবার রোগী দেখেন। করোনা চলাকালীন সময়ে তিনি ঠাকুরগাঁওয়ে রোগী দেখছেন না। তিনি এই হাসপাতালে আগত রোগীদের লাইফ কেয়ার ক্লিনিকে বিভিন্ন পরীক্ষা করতে বলেন। এছাড়াও রোগীদের সাথে বিভিন্ন সময় খারাপ আচরণ করছেন। রোগীরা প্রতিবাদ করলে থানা পুলিশেও ভয় দেখায়। সম্প্রতি মারামারির ঘটনায় এক রোগীর সাথে সার্টিফিকেট তৈরির জন্য ডা. মুকুল ২০ হাজার টাকা উৎকোচ চায়। রোগীর স্বজনেরা ডা. মুকুলকে ৫ হাজার টাকা দিয়ে সার্টিফিকেট গ্রহণ করেন।

পাকের হাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সহকারী সার্জন ডাক্তার শামসুদ্দোহা মুকুল কাছে কয়েকজন সংবাদ কর্মী তার নিকট স্বাক্ষাতকার দেওয়ার জন্য গেলে সংবাদকর্মীদের ভিজিটিং কার্ড নেওয়ার পর অন্য কক্ষে বসিয়ে রেখে স্থানীয় সাংবাদিক ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ফোন করে পাকের হাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে ডেকে আনেন ডা. শামসুদ্দোহা মুকুল। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা উপস্থিত হয়ে যায় তার পক্ষে সাফাই গাওয়ার জন্য। পরে বসিয়ে রাখা সংবাদ কর্মীদের নিকট অন দ্যা রেকর্ড কোন কথা বলবে না শর্তে তিনি উপস্থিত হন। পরে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের কথা বলার পর তিনি বলেন, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমার দাদু হয়। তিনি তাকে এই হাসপাতালে বসিয়েছেন। নাসরিনের সিজার করিয়েছেন স্বীকার করে তিনি বলেন, আবারও ৮দিন করা হয়েছে। দ্বিতীয় অপরেশন কারণ হিসাবে কোন ব্যাখ্যা করেননি।

রোগীদের বাধ্য করে পাশ্ববর্তী ক্লিনিকে কমিশনের আশায় রোগীদের বিভিন্ন টেষ্ট করা, রোগীদের সাথে খারাপ আচারণ, ভুল চিকিৎসার, ক্ষমতার দাপট ইত্যাদি জানার জন্য কথা বলায় তিনি উত্তেজিত হয়ে বলেন, আমি মানুষ হিসাবে এত বেশি খারাপ না। আপনার যত অভিযোগ বলছেন তার আংশিক সত্য আছে। এরপর তিনি স্থানীয় ও ঢাকার সাংবাদিকদের ফোন করে নিউজ না করার জন্য দিনাজপুরের সাংবাদিকদেরকে অনুরোধ করিয়েছেন। এই অনুরোধের তালিকায় সাবেক পরারাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সাবেক এপিএসও রয়েছেন।

দিনাজপুর সিভিল সার্জন ডা. আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ডাক্তার শামসুদ্দোহা মুকুরের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। তিনি বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ের লোক দিয়ে ফোন করানো অভ্যাস রয়েছে। তারপর যেহেতু আইন সবার জন্য। তাই এই করোনা পরিস্থিতে কোন চিকিৎকের চিকিৎসা অবহেলা সহ্য করা হবে না। তদন্ত করে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

দিনাজপুর জেলা প্রশাসক মাহমুদুল আলম বলেন, চিকিৎসা সেবা নিয়ে কেউ ছিনিমিনি করলে বা বানিজ্য করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

রাজনীতি/কাজল


LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here