মামলা থেকে বাঁচতে লুপার জাল প্রত্যয়নপত্র!

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বরিশালের পটুয়াখালীর গলাচিপায় অন্তঃসত্ত্বা গৃহকর্মী শাহিনুর ও শিশুকন্যা সেলিনা (৫) হত্যা মামলাটিকে রাজনৈতিক মামলা হিসেবে বিবেচনার জন্য কথিত সাংবাদিক লুপা তালুকদার ও তার পরিবারের সদস্যরা জাল প্রত্যয়নপত্র তৈরি করেছিলেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের নাম ব্যবহার করে জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে নিজেদের আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য হিসেবে প্রত্যয়িত করেন তারা। এরপর হত্যা মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি হিসেবে লুপা তালুকদার, তার বাবা হাবিবুর রহমান নান্না মিয়া তালুকদার, ভাই লিটন ও লিকন তালুকদার অব্যাহতি পেয়েছিলেন বলে দাবি করেন গলাচিপার স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা।

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি হারুন অর রশীদ দাবি করেন, লুপা তালুকদার ও তার পরিবারের সদস্যদের আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য হিসেবে কোনো প্রত্যয়নপত্র দেননি তিনি ও তার সাধারণ সম্পাদক। তারা তাদের নাম ব্যবহার করে জাল প্রত্যয়নপত্র তৈরি করেছে। বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পাওয়ার পর তিনি গত শুক্রবার গলাচিপায় থানায় তাদের স্বাক্ষর জাল করার বিষয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।

তবে লুপা তালুকদারের বড় ভাই মোস্তাইনুর রহমান লিকন তালুকদার মোবাইল ফোনে বলেন, গলাচিপা উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সাংসদের স্বাক্ষরিত প্রত্যয়নপত্র নিয়েছিলেন। জমি নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে তারা এখন মিথ্যা কথা বলছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

পটুয়াখালীর গলাচিপার স্থানীয়দের ভাষ্য, লুপার বাবা হাবিবুর রহমান নান্না মিয়া তালুকদার ছিলেন চিহ্নিত রাজাকার। পটুয়াখালী মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তৈরি করা রাজাকারের তালিকায় ১১ নম্বরে লুপার বাবার নাম রয়েছে। এছাড়া ওই পরিবারের আরও দুজন রাজাকার ছিলেন। এসব তথ্য এলাকার সবাই জানেন। তারপরও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের ‘ম্যানেজ’ করে নিজেদের আওয়ামী লীগের পরিবারের সদস্য ও নেতাকর্মী হিসেবে তাদের কাছ থেকে প্রত্যয়নপত্র নিয়েছিলেন হত্যা মামলা থেকে বাঁচার জন্য।রাজধানী শাহবাগ থানায় হওয়া একটি অপহরণ মামলায় সম্প্রতি লুপা তালুকদার গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার পরিবারের অতীত অপকর্মের খবর প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদেরও অনৈতিক কর্মকাণ্ড ফাঁস হয়ে পড়ে। এজন্যই তারা বাঁচার জন্য নতুন করে জিডি করেছেন।

সম্প্রতি ফুলবিক্রেতা শিশুকন্যা জিনিয়া (৯) অপহরণের ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) হাতে লুপা গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই তার অতীত কর্মকাণ্ডের তথ্য বেরিয়ে আসতে থাকে। রাজাকার পরিবারের সদস্য হয়েও হত্যা মামলা থেকে বাঁচার জন্য কীভাবে আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য হলেন এ সংক্রান্তে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত শুক্রবার গলাচিপা উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি হারুন অর রশীদ গলাচিপা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। তাতে উল্লেখ করেন, গলাচিপা পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত হাবিবুর রহমান নান্না তালুকদারের মেয়ে লুপা তালুকদার আমার ও গলাচিপা উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফার টিটোর স্বাক্ষরিত আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য হিসেবে একটি প্রত্যয়নপত্র উপস্থাপন করেছে। প্রকৃতপক্ষে আমি বা বর্তমান সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা টিটো লুপা তালুকদার বা তার পরিবারের কাউকে এ ধরনের কোনো প্রত্যয়নপত্র প্রদান করিনি।

অপহরণ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে লুপা তালুকদার বর্তমানে কারাগারে থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে তার বড় ভাই লিকন তালুকদার গতকাল রাতে মোবাইল ফোনে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতারা এখন মিথ্যা কথা বলছেন। তৎকালীন উপজেলা সভাপতি হারুন অর রশিদ, সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা টিটো ও তৎকালীন সাংসদ গোলাম মাওলা রনির স্বাক্ষরিত সুপারিশ ও প্রত্যয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া আমার ছোট ভাই প্রয়াত লিটুন তালুকদার গলাচিপা ঘাট শ্রমিক লীগের সভাপতি ছিলেন। লুপা ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ করেছে। ’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন না পেয়ে জাতীয় পার্টির প্রতীক নিয়ে গত ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন করেছি। আমার বাবা রাজাকার ছিলেন কি না তা জানি না। তখন তো আমরা ছোট ছিলাম। তালিকায় তার নাম থাকার কথাও শুনিনি। আমার সঙ্গে অনেকের জমিজমা নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে বিধায় মিথ্যা কথা বলছে। ’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৩ সালে পটুয়াখালীর গলাচিপায় থানায় লুপা বেগম, তার বাবা ও দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়। শাহিনুর নামে এক গৃহকর্মী লুপাদের বাসায় কাজ করত। সেই সুযোগে লুপার স্বামী ও ভাই মিলে ওই গৃহকর্মীকে নিয়মিত যৌন নীপিড়ন করতেন। পরে শাহিনুর অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে বিষয়টি জানাজানি হয়। এরপর লুপা, তার স্বামী, লুপার বাবা ও দুই ভাই মিলে শাহিনূর ও তার পাঁচ বছর বয়সী শিশুকন্যাকে পরিকল্পিতভাবে অপহরণ করে হত্যার পর বস্তাবন্দি করে নদীতে ফেলে দেয় লাশ। এ ঘটনার তদন্তে লুপা, লুপার বাবা হাবিবুর রহমান ওরফে নান্না মিয়া তালুকদার, লুপার দুই ভাই মোস্তাফিজুর রহমান ওরফে লিটন তালুকদার, মোস্তাইনুর রহমান ওরফে লিকন তালুকদার, লুপার স্বামী রফিকুল ইসলাম বাদল ওরফে শহীদ বাদল, সুজন, হাকিম আলী, সেরাজ মিয়া, আলী হোসেন, ইছাহাক আলী ওরফে ইছছেক আলীসহ বেশ কয়েকজনকে সম্পৃক্ততার তথ্য-প্রমাণ পেয়ে তাদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন গলাচিপা আওয়ামী লীগ নেতা হারুন অর রশীদ ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা টিটোর প্রত্যয়নপত্র নিয়ে এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর মাধ্যমে নিজেদের আওয়ামী লীগ পরিবার হিসেবে প্রচার করতে থাকেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন অধিশাখা-১-এর উপসচিব মো. মিজানুর রহমান গলাচিপা থানার ওই মামলার মামলা নং-১ তারিখ(১/৬/০৩) ধারা ৩৬৪/৩০২/২০১/৩৪ দ-বিধির আসামি মোস্তাফিজুর রহমান ওরফে লিটন, মোস্তাইনুর রহমান ওরফে লিকন, হাকিম আলী, আলী হোসেন ও মোসা. নাজনীন আক্তার ওরফে লুপা বেগমের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন না চালানোর সিদ্ধান্তের কথা পটুয়াখালী জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে জানিয়ে দেন। এ ঘটনায় সহযোগী একাধিক আসামির সাজার রায় হলেও লুপা ও তার পরিবারের সদস্যরা এ মামলা থেকে অব্যাহতি পান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকার ফুলবিক্রেতা শিশু জিনিয়াকে অপহরণের ঘটনায় গত সোমবার মধ্যরাতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে নাজনীন আক্তার ওরফে লুপা বেগম ওরফে লুপা তালুকদারকে গ্রেপ্তার করে ডিবির রমনা জোনাল টিম। জিনিয়া টিএসসি এলাকায় ফুল বিক্রয় করত এবং মা সেনুয়া বেগমের সঙ্গে টিএসসিতেই থাকত। জিনিয়ার মা গত ২ সেপ্টেম্বর জিনিয়ার নিখোঁজ থাকার বিষয়ে শাহবাগ থানায় একটি জিডি করেন। ডিজির তদন্ত, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যমতে জানা যায় দুজন নারী ফুচকা খাওয়ায় জিনিয়াকে। তাকে নিয়ে টিএসসি এলাকায় ঘোরাফেরা করে। একপর্যায়ে কৌশলে বাসায় নিয়ে যায়। এ ঘটনায় সোমবার শাহবাগ থানায় অপহরণ মামলা হয়।

রাজনীতি/কাসেম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here