‘রানা প্লাজা’ হয়ে উঠতে পারে গুলিস্তানের বঙ্গবাজার মার্কেট’

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ যেকোন সময় ঘটতে পারে রানা প্লাজার মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনা সিটি কর্পোরেশন পুনঃনির্মাণের নির্দেশনা দিলেও আটকে আছে আদালতের রিটে অভিযোগের তীর এমপি আফজালের দিকে ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে রাজধানীর গুলিস্তান এলাকার বঙ্গবাজার মার্কেট। পুরাতন এবং ভঙ্গুর একতলা মার্কেটের উপর কাঠ দিয়ে আরও দুইতলা বানিয়ে নিয়েছে মার্কেট কমিটি। কোনও প্রকার পরিকল্পনা এবং আপৎকালীন মোকাবেলা ব্যবস্থা না রেখেই সম্পূর্ণ অবৈধভাবে বাড়ানো হচ্ছে মার্কেটের আয়তন। মাঝে মধ্যে অতিরিক্ত ভরের কারণে পাটাতনের কাঠ খসে পড়ার ঘটনাও শোনা যায়।

এছাড়া মার্কেটের ভেতরে-বাইরে, ডানে-বামে ছড়িয়ে আছে গ্যাসের সিলিন্ডার। ফলে যেকোন সময় মার্কেটটিতে আরেকটি রানা প্লাজা বা চুড়িহাট্টার মতো ট্রাজেডি ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।

অভিযোগ রয়েছে, কিশোরগঞ্জ-৫ (নিকলী-বাজিতপুর) আসনের সংসদ সদস্য মো. আফজাল হোসেন এই মার্কেটের দখল নিয়ে সভাপতি হয়ে আছেন এক যুগ ধরে। তার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে মজু চেয়ারম্যান, বাসেত মাস্টার, জহির, দেলুসহ কয়েকজন এই মার্কেটের নকশা বহির্ভূত বর্ধিতকরণ করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। ফলে যেকোন সময় দুর্ঘটনায় প্রাণহানির আশংকার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে মার্কেটটি।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বছরের ৬ জানুয়ারি ঢাকা সিটি কর্পোরেশন মার্কেটটি ভেঙে পুনঃনির্মাণের টেন্ডার আহ্বান করে। টেন্ডারে অংশ নেয়া সর্বনিম্ন দরদাতাকে ওই বছরের ১০ এপ্রিল কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আফজাল হোসেনের ইন্ধনে কয়েকজন ব্যবসায়ী এই নির্দেশনার স্থগিত বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ চেয়ে আদালতে রিট করেন। ফলে থেমে যায় মার্কেট ভাঙা ও মেরামতের কাজ।

অভিযোগ রয়েছে, সাংসদ আফজাল হোসেন তার অপ্রাপ্তবয়স্ক তিন সন্তানকে ‘ক্ষতিগ্রস্ত হকার’ হিসেবে দেখিয়ে বঙ্গমার্কেটের পাশাপাশি রাজধানীর গুলিস্তানে সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন বিপণিবিতান ঢাকা ট্রেড সেন্টারেও তিনটি দোকান বরাদ্দ নিয়েছিলেন। ২০১০ সালের ৩০ মার্চ ৩৯/১, ৩৫/২ ও ৩৫/১ নম্বর সিরিয়ালের ওই দোকানগুলো বরাদ্দ নেওয়ার সময় তার তিন সন্তান তুষার, হৃদি ও বৃষ্টির বয়স ছিল যথাক্রমে ১৪, ৮ ও ৬ বছর। বরাদ্দ নেওয়ার কিছুদিন পরই সাংসদ আফজাল প্রতিটি দোকান ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেন। এভাবে নামে-বেনামে ওই মার্কেটে বিপুলসংখ্যক দোকান বরাদ্দ নেওয়ার পর আফজাল তা চড়া দামে বিক্রি করে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এমন অভিযোগ পেয়ে বিষয়টি অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে আফজাল হোসেনের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের বিষয়ে কমিশনের সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন।

তিনি বলেন, ‘এমপি আফজাল হোসেন ও তার পরিবারের সদস্যদের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধান সংক্রান্ত কমিশনের আদেশের কপি আমরা ইতিমধ্যে হাতে পেয়েছি। কমিশনের আইন অনুযায়ী আফজাল ও তার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিবর্গের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, দায়-দেনা, আয়ের উৎস ও অর্জনের বিস্তারিত বিবরণী চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দুদকের একজন কর্মকর্তাকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’

সাংসদ আফজালের বিরুদ্ধে দুদকে জমা হওয়া একটি অভিযাগে বলা হয়, আফজাল ও তার ছোট ভাই বাজিতপুর পৌরসভার মেয়র আনোয়ার হোসেন (আশরাফ) বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর অবৈধ সম্পদ অর্জনের মাধ্যমে এখন এলাকার সবকিছুর নিয়ন্ত্রক। তাদের বিরুদ্ধে এলাকায় প্রতিপক্ষের ওপর হামলা ও মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো থেকে শুরু করে খাসজমি, দোকানপাট, বাড়িঘর, বালুমহাল দখলসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্যও না হয়ে ২০০৮ সালে প্রথমবার এমপি হয়ে নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন আফজাল। তার এসব কাজে সহযোগী হয়ে ওঠেন ছোট ভাই আনোয়ার। গত বছরের ২১ আগস্ট আফজালের ক্যাডার হিসেবে পরিচিত যুবলীগ নেতা আনিসুর রহমান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে ঘোড়াউত্রা নদীতে বালুমহাল দখলের সময় প্রতিপক্ষের তিন ব্যক্তিকে কুপিয়ে আহত করা হয়। যাদের ওপর হামলা করা হয়েছে উল্টো তাদের বিরুদ্ধেই মামলা হয়। এভাবে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিপুল অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, বাজিতপুর বাজারে নিজের নামে একটি পাঁচতলা শপিং মল তৈরি করেন আফজাল। ৫০ শতাংশ জায়গার ওপর তৈরি ওই শপিং মল সম্প্রসারণের জন্য এলাকার পাঁচজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীকে তাদের ব্যবসায়িক স্থাপনা থেকে উচ্ছেদ করেন। এছাড়া মার্কেটটির সামনের অংশে থাকা খাল ভরাট করেন। বাজিতপুর বাজারে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য নির্ধারিত খাসজমির প্লটটিও দখল করে রেখেছেন আফজাল। বাজিতপুরে নিজের গ্রাম শশের দিঘি নোয়াপাড়া দিলালপুরে তিনতলা ভবন এবং বাজিতপুর পৌর এলাকার ডাকবাংলোর সামনে ২৭৫ শতাংশ জমি রয়েছে আফজালের। এ ছাড়া আফজাল দেশ থেকে অর্থ পাচার করে সিঙ্গাপুরে ফ্ল্যাট ক্রয় এবং অস্ট্রেলিয়া ও মালয়েশিয়ায় বাড়ি কিনেছেন।

ক্যাসিনো কারবারের সঙ্গেও আফজালের সংশ্লিষ্টতা ছিল উল্লেখ করে দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে বলা হয়, বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের সহযোগী ছিলেন সাংসদ আফজাল। তিনি সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন ক্যাসিনোর তালিকাভুক্ত ‘জুয়াড়ি’। রাজধানীর মুক্তিযুদ্ধা ক্রীড়াচক্রসহ বিভিন্ন ক্লাবে তার অংশীদারত্ব ছিল। তার রয়েছে চারটি পাসপোর্ট। নামে-বেনামে আফজালের বিপুল সম্পদের মধ্যে রয়েছে আফজাল সুজ লিমিটেডের মালিকানা, ৬/৪ সেগুনবাগিচায় হাসিনুর গ্রিন কটেজে বি-৪ ও বি-৫ নম্বরের দুটি ফ্ল্যাট, ৯৫ আগামসি লেনে পাঁচতলা বাড়ি, লালমাটিয়ায় ফায়ার ব্রিগেড কার্যালয়ের পেছনে লাকী বিল্ডার্সের তৈরি ভবনে স্ত্রীর নামে একটি ফ্ল্যাট ও বংশালে সাততলা দুটি বাড়ি। এ ছাড়া রাজধানীর দক্ষিণ বনশ্রীর প্রধান সড়কসংলগ্ন একটি সাততলা বাড়ি, উত্তরায় হুইপ আতিউর রহমান আতিকের সঙ্গে যৌথভাবে সাত কাঠার প্লট এবং কেরানীগঞ্জ ব্রিজের ঢালে ছয় কাঠা জমির ওপর তৈরি কারখানার মালিক তিনি।

২০১৪ সালের ২৪ জুলাই সাংসদ আফজালের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত। ঢাকা ট্রেড সেন্টারের কাপড় ব্যবসায়ী কামাল হোসেন রিপনের করা মামলায় আফজালসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে ওই পরোয়ানা জারি করা হয়। মামলার বাদী তার আর্জিতে বলেন, এমপি আফজাল তার তিন সন্তানকে ‘ক্ষতিগ্রস্ত হকার’ দেখিয়ে ঢাকা ট্রেড সেন্টারের তিনটি দোকান বরাদ্দ নেন। রিপন প্রতিবাদ করলে এমপি আফজাল তাকে ভয়ভীতি দেখান। বরাদ্দ নেওয়ার কিছুদিন পরই তিনি প্রতিটি দোকান ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেন।

এভাবে রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটে প্রায় আড়াইশ দোকান বরাদ্দ নিয়ে বিক্রি করে দিয়েছেন আফজাল। তিনি ঢাকা ট্রেড সেন্টার দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের পদ এক দশক ধরে দখল করে আছেন। মার্কেটটির বেজমেন্ট, গাড়ি পার্কিং এবং এক্সেলেটরের সিঁড়ির জায়গাসহ যেখানে ফাঁকা পেয়েছেন, সেখানেই অবৈধভাবে দোকান নির্মাণ করেছেন।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এমপি আফজাল হোসেন বলেন, ‘আমার কোন অবৈধ সম্পদ নেই। বিভিন্ন মার্কেটের ব্যবসায়ীরা ভালোবেসে আমাকে দায়িত্বে বসান বার বার।’ বঙ্গমার্কেট পুনঃনির্মাণের বিরুদ্ধে রিট করতে ইন্ধন দেয়ার বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে এটা ব্যবসায়ীদের বিষয় বলে এড়িয়ে যান তিনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here