শেখ হাসিনা উড়াল সড়ক; ভাগ্য বদলাবে হাওরবাসীর

নিজস্ব প্রতিবেদক, সুনামগঞ্জ ঃ ২০১১ সালে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে এক কৃষক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, গোপালগঞ্জ আর সুনামগঞ্জ আমার কাছে সমান। উন্নয়ন ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া হাওরবাসীর উন্নয়নে আন্তরিকভাবে কাজ করতে চাই। বঙ্গবন্ধু কন্যা হাওরবাসীকে যে কথা দিয়েছিলেন সেই কথাগুলো রেখে হাওরপাড়ের মানুষের ভরসাস্থল হয়ে উঠেছেন।

প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিপরিষদে সুনামগঞ্জের কৃতী সন্তান, হাওররত্ন, সাবেক সচিব ও সুনামগঞ্জ-৩ আসনের বারবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য এম এ মান্নানকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে দিয়ে হাওরবাসীর স্বপ্ন পূরণের দ্বার উন্মোচন করেন। পাশাপাশি হাওরপাড়ের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করারও দায়িত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।

ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট, নার্সিং ইনস্টিটিউট, বিআরটিএ ট্রেনিং সেন্টার, ম্যাটস, সুনামগঞ্জের পাগলা-রানীগঞ্জ-আশারকান্দি সড়কের রানীগঞ্জ সেতুসহ বিপুল উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন পরিকল্পনামন্ত্রী। এ ছাড়া ছাতকের সুরমা সেতু, বিশ্বম্ভরপুরের ফতেহপুর আবয়া সেতুর পুনর্নির্মাণ কাজ শুরু করেন।

সুনামগঞ্জ সিলেট সড়ক প্রশস্তকরণের প্রায় ৭০ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় হাওরবাসীর স্বপ্ন পূরণে সুনামগঞ্জ-নেত্রকোনা মহাসড়কের মান্নানঘাট থেকে গুল্লা গ্রাম হয়ে ধর্মপাশার মধুপুর পর্যন্ত সাড়ে ১০ কিমি স্থানে গভীর হাওরে উড়ালসেতুসহ রাস্তা নির্মাণ এবং দিরাই-শাল্লা সড়ক নির্মাণ প্রকল্পটি চলতি মাসেই একনেকের সভায় অনুমোদন করা হবে। এই প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে সুনামগঞ্জ থেকে নেত্রকোনা এবং নেত্রকোনা থেকে ঢাকা পর্যন্ত অল্প সময়ে স্বল্প খরচে আসা যাওয়া সম্ভব হবে হাওরবাসীর।

সূত্র জানায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে সরকারের সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। প্রকল্পের সম্ভাব্য মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৫ সাল পর্যন্ত। এই প্রকল্পে প্রায় ১০৭ কিমি দৃষ্টিনন্দন সড়ক নির্মাণ হবে। আরো ২৮ কিমি ডুবন্ত সড়ক, ইউনিয়ন ও উপজেলা সড়ক সংযোগ থাকবে।

উপজেলা সড়কে ২ হাজার ৯৮৭ মিটার ও ইউনিয়ন সড়কে ৬৮৫ মিটার সেতু এবং ৭৭৫ মিটার কালভার্টও নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের সবকিছুই হবে দৃষ্টিনন্দন ও চোখ ধাঁধানো। প্রকল্পটি চলতি মাসেই একনেকে অনুমোদিত হওয়ার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কারণ হাওরের প্রকৃতি বিবেচনা করেই বিরল উড়াল সড়ক নির্মাণের কাজ প্রধানমন্ত্রীর মাথা থেকেই এসেছে।

উড়াল সড়কের প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে হাওর অঞ্চলের মানুষের ব্যবসা ও পর্যটনের দ্বার উন্মোচিত হবে। সহজেই দেশ-বিদেশ থেকে পর্যটকরা সুনামগঞ্জে প্রবেশ করে হাওরের উড়াল সড়ক দিয়ে নেত্রকোনা হয়ে ঢাকায় চলে যেতে পারবে। এই প্রকল্পের কাজ শেষ হলে বেসরকারি উদ্যোক্তারা হোটেল-মোটেল নির্মাণ, হাওরে ঘুরে বেড়ানোর জন্য নৌকা-স্পিডবোটসহ নানা জলযান তৈরি করবে। তাতে হাওরপাড়ের মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হবে।

জানা যায়, সরকারিভাবে উড়াল সড়কের দুই পাশে কিছুদূর দূর ‘ইয়ুথ হোস্টেল’ গড়ে তোলা হবে। টিনশেডের বাংলো টাইপের হোস্টেলও থাকবে। সেখান থেকে দেখা যাবে হাওরের প্রাকৃতিক মনোরম দৃশ্য। সেই সাথে হোস্টেলগুলোতে নিরাপদ পানি ও রান্নাবান্নার ব্যবস্থা থাকবে। হাওর এলাকায় ‘গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্প নিয়ে এখন কাজ চলছে পুরোদমে।

সূত্র জানায়, এ প্রকল্পের প্রাথমিক প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা। ইতোমধ্যে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠকও করেছেন। প্রকল্পের বিভিন্ন দিক যাছাই-বাছাই কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর একান্ত চিন্তাভাবনা থেকে হাওরে উড়াল সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। যার কারণে উড়াল সড়কটির নাম হবে ‘শেখ হাসিনা উড়াল সড়ক’। একনেকে অনুমোদনের পর নামকরণের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।

দিরাই থেকে শাল্লা, আজমিরীগঞ্জ-বানিয়াচং-হবিগঞ্জ হয়ে হাওরের বুক চিরে একটি মহাসড়ক নির্মাণ প্রকল্প একনেকে পাস হওয়ার পর কাজও শুরু হয়ে গেছে। মোহনগঞ্জ-নেত্রকোনার সঙ্গে একটি এবং দিরাই-হবিগঞ্জের সঙ্গে আরেকটি মহাসড়ক হলে হাওরের যোগাযোগ চিত্র পাল্টে যাবে।

প্রকল্প সূত্র আরো জানায়, ১৯০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে উপজেলা অল সিজন সড়ক ১০৬ দশমিক ৫৮ কিমি, উপজেলা সাব-মারসিবল সড়ক ২৮ দশমিক ২১ কিমি, ইউনিয়ন অল সিজন সড়ক ১৯ দশমিক ২০ কিমি, ইউনিয়ন সাব-মারসিবল সড়ক ১৪ দশমিক ৬৯ কিমি, গ্রাম সাব-মারসিবল সড়ক ৮ দশমিক ১৭ কিলোমিটার এবং উপজেলা এলিভেটেড (উড়াল) সড়ক ১৩ দশমিক ৪১ কিলোমিটার। পাশাপাশি উপজেলা সড়কে ২ হাজার ৯৮৭ মিটার ব্রিজ, ইউনিয়ন সড়কে ৬৮৫ মিটার ব্রিজ, উপজেলা সড়কে ৬৬৭ মিটার কালভার্ট, ইউনিয়ন সড়কে ৭৫ মিটার কালভার্ট এবং গ্রাম সড়কে ৩৩ মিটার কালভার্ট নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী আবদুর রশীদ খান জানান, সুনামগঞ্জ বাংলাদেশের অন্যান্য স্থানের মতো নয়। হাওরের কারণে এই জেলার অধিকাংশ উপজেলা সড়ক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন। এসব উপজেলার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে অনেকগুলো প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে হাওরবাসীকে আর উন্নয়নে পিছিয়ে থাকতে হবে না। প্রধানমন্ত্রী হাওরবাসীর উন্নয়নে যা যা করা দরকার তাই করতে নির্দেশনা দিয়েছেন।

স্থানীয় সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন জানান, ২০১১ সালে বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাহিরপুরের কৃষক সমাবেশে হাওরবাসীর সার্বিক উন্নয়নে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তারই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে হাওরে মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছেন।

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাওরবাসীকে ভালোবাসেন বিধায় বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে আমাকে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে নির্দেশনা দিয়েছেন। আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ পালন করছি। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সুনামগঞ্জকে আর অবহেলিত জেলা হিসেবে আখ্যায়িত হতে হবে না। সুনামগঞ্জ হবে পর্যটকদের জন্য উত্তম স্থান। দেশ-বিদেশ থেকে হাজারো পর্যটক ও প্রকৃতিপ্রেমীরা ছুটে আসবেন এবং হাওরপাড়ের মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

রাজনীতি/কাসেম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here