সাদেক বাচ্চুর মৃত্যুতে চলচ্চিত্র অঙ্গনে শোকের ছায়া

জেড, আর সুমনঃ বর্ষীয়ান অভিনেতা সাদেক বাচ্চুর মৃত্যুতে চলচ্চিত্র অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দাপুটে এই খল অভিনেতার মৃত্যুতে চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ করা হচ্ছে। 

সাদেক বাচ্চুর মৃত্যুতে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক-পরিবেশ সমিতির সভাপতি খোরশেদ আলম খসরু বলেন, ‘চলচ্চিত্রের এমন ক্রান্তিলগ্নে আমরা একের পর এক গুণীজন হারাচ্ছি। সাদেক বাচ্চু ভাইকে এত তাড়াতাড়ি হারাবো, এটা ভাবতেও পারিনি। আমরা সমিতির পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করছি। তার আত্মার শান্তি কামনা করছি।’

বাংলাদশে চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার বলেন, ‘মৃত্যু চিরন্তন সত্য। এটা সবাইকে মেনে নিতে হবে। এমন গুণী শিল্পীর চলে যাওয়াটা অনেক কষ্টের। আমাদের চলচ্চিত্র অঙ্গন একজন গুণী শিল্পকে হারালো। আমরা হারালাম সত্যিকারের একজন ভালো মানুষকে। পরিচালকদের পক্ষ থেকে আমরা শোক প্রকাশ করছি।’

চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খান বলেন, ‘সাদেক বাচ্চু ভাই শুধু একজন অভিনেতা নন, তিনি ছিলেন আমাদের অভিভাবক। তিনি সবসময় আমাদের পরামর্শ দিতেন। অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই আমরা তার পাশে ছিলাম। এত দ্রুত চলে যাবেন, বুঝতে পারিনি। তার আত্মার শান্তির জন্য সবাই দোয়া করবেন।’

সাদেক বাচ্চুর মৃত্যুতে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় চিত্রনায়ক আলমগীর বলেন, ‘আমি কিছুক্ষণ আগে খবরটি শুনেছি। খুবই কষ্ট পেয়েছি। সাদেক বাচ্চু কতটা সফল বা শক্তিশালী অভিনেতা ছিলেন সেটি নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। দেশের মানুষ সেটি জানেন। আমি শুধু বলতে চাই, তিনি কতটা ভালো মানুষ ছিলেন। ভাইবোনদের অনেক ছোট রেখেই সাদেক বাচ্চুর বাবা মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর ভাইবোনদের প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি নিজে অনেক দেরিতে বিয়ে করেন। এ থেকেই বোঝা যায় তিনি কতটা ভালো মানুষ ছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রাদুর্ভাবে সব দেশের চলচ্চিত্রই সংকটকাল অতিক্রম করছে। এই সংকট থেকে দেশের চলচ্চিত্র আবার ঘুরে দাঁড়াতে যারা ভূমিকা রাখতে পারতেন, সাদেক বাচ্চু তাদের অন্যতম। তার চলে যাওয়া আমাদের চলচ্চিত্রের জন্য অনেক বড় ক্ষতি। সবাই তার জন্য দোয়া করবেন। সৃষ্টিকর্তা যেন তাকে শান্তিতে রাখেন।’

এদিকে সাদেক বাচ্চুর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে অভিনেতা আরেফিন শুভ বলেছেন, ‘আমরা আরও একজন রত্ন হারালাম। উনি উনার ক্যারিয়ারে শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যা দিয়ে গেছেন তা রিপ্লেসেবল না। অন্য কারও বা কিছুর মাধ্যমে রিপ্লেস করা যাবে না। একটা অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল আমাদের।’

ওমর সানী স্মৃতিতে লিখেন, ‘সাদেক বাচ্চু একটা নাম, একজন অভিনেতা, একটা ইতিহাস। বহু বছর আগে হুমায়ুন ফরীদি ভাই যখন সুপারস্টার তখন তার শিডিউল পাওয়া ভিষণ দুষ্কর। পরিচালক উত্তম আকাশ দাদা এবং আমি চিন্তা করলাম কি করা যায়। বাচ্চু ভাইয়ের কাছে গেলাম। বাচ্চু ভাই বলল উত্তম তুমি আমার সাথে মজা করছো, তোমার ছবিতে নিবা আমারে ওমর সানির সাথে।

আমি বললাম না বাচ্চু ভাই, আপনি থাকবেন। সেই আখেরি হামলা, মুক্তির সংগ্রাম, রঙিন রংবাজ, আরো বহু ছবি একসাথে জুটি হলাম। আমার কাছে মনে হতো একটা ভালো মানুষের ডিকশনারি তিনি।’

সাদেক বাচ্চুর বিদেহি আত্মার শান্তি কামনায় সানি লেখেন, ‘আপনি চলে গেলেন আমাদেরকে রেখে। আল্লাহ উনাকে জান্নাত নসিব করুন। এবার বুঝি আমাদের পালা। ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি সবার কাছে। ক্ষমা করবেন। বাচ্চু ভাই আমার জীবনের ছবি হয়ে থাকবেন।’

ঢালিউড কিং শাকিব খান স্মৃতি লিখেন, সাদেক বাচ্চু ভাই শুধু আমার সহশিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন চলচ্চিত্রে আমার অভিভাবকদের একজন। আমাকে তিনি সবসময় আগলে রেখে ভালোর পথে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিতেন। মানসিক সাপোর্ট দিয়ে সাহস যোগাতেন।

নিয়মিত আমার খোঁজখবর রাখতেন। সহশিল্পী কিংবা অভিভাবকত্বের বাইরেও বাচ্চু ভাই আমার প্রতি এক অদৃশ্য মায়া দেখাতেন। তিনি আর নেই শোনা মাত্রই আমার ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে।’

শাকিবের স্ট্যাটাসে তিনি আরও বলেন, ‘চলচ্চিত্রে এতগুলো বছর ধরে কাজ করে অনেকের সঙ্গে পরিচয় ও সুসম্পর্ক হলেও সবাই আপন হতে পারেনি। হাতে গোনা কিছু মানুষ হৃদয়ে ঠাঁই পেয়েছে। তাদেরই একজন ছিলেন সাদেক বাচ্চু ভাই। তার সঙ্গে মন খুলে কথা বলতাম। সবকিছু শেয়ার করতাম। তিনি আমার ভালো কাজে যেমন উৎসাহ দিতেন, তেমনি মন্দ শুনলে খুব কষ্ট পেতেন। এমন গুণী অভিভাবক আর কোথায় পাবো! গত ২০ বছর ধরে আমরা একসঙ্গে পথ চলছি। সংস্কৃতির সব মাধ্যমে সফল হওয়া এ মানুষটিকে আজ হারালাম। একজন সহকর্মী হারানোর বেদনার চেয়ে প্রিয়জন হারানোর ব্যক্তিগত বেদনা বেশি প্রকট হয়ে উঠছে। পরম শ্রদ্ধায় সাদেক বাচ্চু ভাইয়ের বিদেহি আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। যেখানেই থাকবেন দোয়া করি শান্তিতে থাকবেন।’

চিত্রনায়িকা পূর্ণিমা এই অভিনেতাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘সম্ভবত ১৯৯৯ সালে উনার সঙ্গে প্রথম ছবি করেছি। বা ২০০০ সাল হবে। প্রথম ছবিতেই আমার নান ছিলেন তিনি। এরপর বাবা-মেয়ে হিসেবে কাজ করেছি আমরা। অনেক ছবিতে ভিলেন ছিলেন। তার সঙ্গে কাজের দিনগুলো অসাধারণ স্মৃতি হয়ে আছে।

শুটিং সেটে তিনি ছিলেন দারুণ মিশুক একজন মানুষ। কিছু একটা ভুল হলে শুধরে দিয়েছেন। তার কাছে অনেককিছু শিখেছি। মেয়ের মতো আদর করতেন। কোথাও দেখা হলেই ‘পূর্ণি…..’ বলে চিৎকার করে উঠতেন। মাথায় হাত রেখে আদর করতেন। সেসব খুব মনে পড়ছে এখন। কী অদ্ভূত! জায়গা শূন্য করে দিয়ে মানুষ হারিয়ে যায় চোখের পলকে!’

চিত্রনায়িকা পপি বলেন, ‘খুব খারাপ সময়ে এগিয়ে চলেছি আমরা। একে একে প্রিয়জনরা সব চলে যাচ্ছেন। তার চেয়েও বড় কথা অভিভাবকদের হারিয়ে ফেলছি। অভিভাবকহীন হয়ে পড়ছে ইন্ডাস্ট্রি। যাদের দেখে শিখেছি অভিনয় তারা চলে যাচ্ছেন। খুব কষ্ট হয়। বাচ্চু ভাইয়ের এভাবে চলে যাওয়াটা মানতেই পারছি না। কী দারুণ একজন ভালো মানুষ ছিলেন। মহান আল্লাহ উনাকে বেহেশত দান করুক।’

চিত্রনায়ক ফেরদৌস বলেন, ‘সাদেক বাচ্চু আমার খুব কাছের মানুষ। করোনায় তার মত্যু মনটাকে বিষিয়ে দিয়েছে। একে একে সব আপনজনেরা চলে যাচ্ছেন। অভিভাবকহীন হয়ে পড়ছি আমরা।

বাচ্চু ভাইকে আমি ক্যারিয়ারের শুরুতেই পেয়েছি। অসম্ভব ভালো একজন মানুষ। সদালাপী। দেখলে আমার আগে ছুটে আসতেন। জড়িয়ে ধরতেন। আমি কলকাতার সিনেমায় নিয়মিত কাজ করছি এটা উনি খুব এপ্রিশিয়েট করতেন। আশপাশে কেউ থাকলে ডেকে দেখিয়ে বলতেন, ‘ফেরদৌস আমাদের গর্ব’। এসব প্রেরণা, সাহস কোনোদিন ভোলা যাবে না!’

চিত্রনায়ক রিয়াজ বলেন, ‘সম্ভবত সিনেমার মানুষ হিসেবে আমার সঙ্গেই সর্বশেষ বাচ্চু ভাই নিয়মিত কথা বলেছেন। উনি হাসপাতালে যাওয়ার আগে আগে আমাকে প্রায়ই কল দিয়েছেন রাতে। ফোন দিয়েই বলতেন ‘অনেক রাতে ফোন দিলাম তোমারে রিয়াজ, সরি’। উনার অভিনীত একটি ছবি আছে এবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্য জমা পড়েছে। তিনি বারবার বলতেন ‘আমার ছবিটা একটু দেখিস। দেখিস অভিনয়টা কেমন হলো।’ আমি বলতাম ভাই এসবের জন্য আপনার ফোন দেয়ার দরকার নেই। আপনার কাছে আমরা অভিনয় শিখেছি। বোর্ড আপনাকে চেনে, আপনার অভিনয়ের মূল্যায়ণ অবশ্যই করা হবে। তিনি বলতেন, ‘না না না। সবই ঠিক আছে। কিন্তু দুনিয়াটা তো বদলে গেছে। তুই আছিস সেটা আমাদের জন্য আনন্দের, গর্বের। খুব ভালো কাজ করেছিস তুই সবসময়। তোর সঙ্গে কাজ করে আরাম পেয়েছি। সেই তুই আছিস বলেই বলছি। কিছু হোক না হোক তুই মন দিয়ে আমার ছবিটা দেখিস। একটু দেখিস আমার অভিনয়টা।’

চিত্রনায়ক অমিত বলেন, ‘আমার ক্যারিয়ারে বহু বহু কাজ তার সঙ্গে করেছি। বাচ্চু ভাই অভিভাবক ছিলেন। আমি মিশেছি তার সঙ্গে ছোট ভাইয়ের মতো। তিনি ছিলেন আমার আত্মার আত্মীয়। সিম্পল জীবনযাপন ছিলো তার। অহমিকতা, দম্ভ দেখিনি কোনোদিন। তার সঙ্গে এত এত স্মৃতি, কোনোদিন এসব ভোলা যাবে না। আল্লাহ বাচ্চু ভাইকে বেহেস্ত নসীব করুক।’

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে রাজধানীর মহাখালীর ইউনিভার্সাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সাদেক বাচ্চু। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। 

দীর্ঘদিন ধরেই শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন সাদেক বাচ্চু। এরমধ্যে গেল ৬ সেপ্টেম্বর দিনভর তার প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট হয়। ওইদিন রাতেই তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। করোনা ভাইরাসের নমুনা পরীক্ষায় ১১ সেপ্টেম্বর তার রিপোর্ট পজিটিভ শনাক্ত হয়। পরে তাকে মহাখালীর ইউনিভার্সাল হাসপাতালে নেয়া হয়। গত কয়েকদিন সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন ৫০০টিরও বেশি ছবিতে অভিনয় করা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত এই খল অভিনেতা। 

১৯৫৫ সালের ১ জানুয়ারি চাঁদপুরে গুণী এই অভিনেতার জন্ম। পেশাগত জীবনে অভিনয়ের বাইরেও দীর্ঘদিন বাংলাদেশ ডাক বিভাগে চাকরি করেন তিনি। ‘একটি সিনেমার গল্প’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি। 

রাজনীতি/কামরুল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here