স্ত্রী-মেয়ে-শ্যালিকাসহ পাপুলের বিরুদ্ধে মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ দুই কোটি ৩১ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ ও শ্যালিকার একাউন্টে ১৪৮ কোটি অবৈধ লেনদেনের অভিযোগে লক্ষীপুর ২ আসনের এমপি শহিদ ইসলাম পাপুল ও তার স্ত্রী সংরক্ষতি আসনের এমপি সেলিনাসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

বুধবার (১১ নভেম্বর) দুদকের উপ-পরিচালক মো. সালাহউদ্দিন বাদী হয়ে এ মামলা দায়ের করেন।

মামলার আসামিরা হলেন-পাপুল, তার স্ত্রী, মেয়ে ওয়াফা ইসলাম ও সেলিনার বোন জেসমিন আক্তার। বর্তমানে অর্থ ও মানবপাচারের অভিযোগে কুয়েতের কারাগারে আছেন শহিদ ইসলাম পাপুল।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি কাজী শহীদুল ইসলাম পাপুলের বিরুদ্ধে মানবপাচারসহ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত উপায়ে শত শত কোটি টাকা অর্জন করে হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক।

পাপুলের শ্যালিকার হিসাব থেকে ১৪৮ কোটি টাকা পাচার : লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম পাপুলের শ্যালিকা জেসমিন প্রধানের ব্যাংক হিসাবে ১৪৮ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

টাকাগুলো পাচার হয়েছে- এমন প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার পর অনুসন্ধান শেষে মঙ্গলবার (১০ নভেম্বর) কমিশনে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা ও উপপরিচালক মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন। এতে পাপুল, তার স্ত্রী ও সংসদ সদস্য সেলিনা ইসলাম, মেয়ে কাজী ওয়াফা ইসলাম এবং শ্যালিকাকে আসামি করে মামলার অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। অনুমোদনের পর বুধবার (১১ নভেম্বর) তাদের বিরুদ্ধে মামলা করবে কমিশন।

গত ৬ জুন সরকারদলীয় এমপি পাপুল কুয়েতে গ্রেপ্তার হন। এরপর থেকে তিনি দেশটির কারাগারে আছেন। পাপুল আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান মারাফিয়া কুয়েতিয়ার চেয়ারম্যান। ইতিমধ্যে কুয়েত সরকার প্রতিষ্ঠানটিকে কালো তালিকাভুক্ত এবং অবৈধ লেনদেন ও মানবপাচারের অভিযোগে ১৩৮ কোটি টাকা জব্দ করেছে। বাংলাদেশে পাপুল পরিবারের ৫৮৮টি ব্যাংক হিসাবের তথ্য পেয়েছে দুদক, যাতে লেনদেন হয়েছে প্রায় ৬১৬ কোটি টাকা।

অর্থপাচারের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আসার পর এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের পরিচালক পাপুল ও তার পরিবারের সদস্যদের বিষয়ে চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি অনুসন্ধানে নামে দুদক।

দুদকের এক মহাপরিচালক জানান, কমিশনে পাপুলের বিরুদ্ধে ১৭৮ পৃষ্ঠার অভিযোগ জমা পড়ে। এরপর তদন্ত শুরু হয়। অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে আছেন দুদকের উপপরিচালক মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন।

দুদকের এক পরিচালক জানান, পাপুলের স্ত্রী সেলিনা, তাদের মেয়ে কাজী ওয়াফা এবং সেলিনার বোন জেসমিন প্রধানের নাম কমিশনের অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়। এরপর তাদের ঘনিষ্ঠ লক্ষ্মীপুরে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অনুসন্ধান শেষে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে পাপুল এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকে শ্যালিকা জেসমিন প্রধানের হিসাব ব্যবহার করে ১৪৮ কোটি টাকা পাচার করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুদক কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে উল্লেখযোগ্য ব্যবসা না থাকলেও পাপুল পরিবারের নামে ৫৮৮টি ব্যাংক হিসাবে ৬১৬ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালে। এসব লেনদেনের বেশিরভাগই হয়েছে সঞ্চয়ী ও স্থায়ী আমানত হিসেবে। পাপুলের মাত্র দেড় কোটি টাকা জব্দ করা সম্ভব হয়েছে। বাকি অর্থ আগেই তারা তুলে নিয়েছেন। এসব অর্থ পাপুল পাচার করেছেন কিনা তা তদন্ত করবে কমিশন। তার অর্থপাচারের বিষয়ে তথ্য চেয়ে কুয়েত, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

প্রাপ্ত নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পাপুল পরিবারের নামে দিনে শতাধিক এফডিআর হিসাব খোলা হয়েছে। অল্পদিনের ব্যবধানে এসব এফডিআর করা হয়। প্রশ্ন এড়াতে অনেক এফডিআরে ১০ লাখ টাকার নিচে আমানত রাখা হয়।

বিএফআইইউ থেকে দুদকে পাঠানো তথ্যে দেখা যায়, ২০০৫ সালের ৬ আগস্ট একটি বেসরকারি ব্যাংকে সঞ্চয়ী হিসাব খোলেন পাপুল। গত জুনে হিসাবটি জব্দ হওয়ার আগ পর্যন্ত মোট জমা হয় ১ কোটি ২১ লাখ ৮৭ হাজার ৪৫০ টাকা; উত্তোলন করা হয় ১ কোটি ২১ লাখ ৭ হাজার ৭৩৮ টাকা। দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে তার নামে ১৩৬টি হিসাবে প্রায় ৫৭ কোটি টাকা জমার তথ্য মিলেছে। এর মধ্যে তোলা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৫৬ কোটি টাকা। হিসাবগুলোর মধ্যে এক বছর মেয়াদি ৭৯টি, ৬ মাস মেয়াদি ৩টি এবং ৩ মাস মেয়াদি ৩২টি এফডিআর রয়েছে। এ ছাড়া ৩টি এফসি হিসাব ও দুটি ক্রেডিট কার্ড রয়েছে তার।

পাপুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলামের হিসাবে লেনদেন হয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। তার নামে বিভিন্ন ব্যাংকের ৩৩৮টি হিসাবে জমা হয় প্রায় ৮৫ কোটি টাকা; তোলা হয় প্রায় সাড়ে ৮৪ কোটি টাকা। হিসাবগুলোর মধ্যে এক থেকে তিন বছর মেয়াদি ১৪৪টি, তিন মাস মেয়াদি ১৫২টি এবং বাকিগুলো সঞ্চয়ী।

এ দম্পতির মেয়ে কাজী ওয়াফার তিন নারীর সঙ্গে তিনটি যৌথ সঞ্চয়ী হিসাব রয়েছে। আর বিভিন্ন ব্যাংকে নিজ নামে ৬৯টি হিসাবে জমা হয় ১৮ কোটি ১০ লাখ টাকা; তোলা হয় ১৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

আর পাপুলের শ্যালিকা জেসমিন প্রধানের বিভিন্ন ব্যাংকে হিসাবের সংখ্যা ৩৫টি। এসব হিসাবে সর্বোচ্চ ১৮৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকার লেনদেন হয়। এসব হিসাবে জমা হয় প্রায় ৯২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা; তোলা হয় প্রায় ৯২ কোটি ১৪ লাখ টাকা।

এছাড়া পাপুলের সাফা জেনারেল ট্রেডিং এবং তার শ্যালিকা জেডব্লিউ লীলাবালি নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ব্যাংকে চারটি হিসাবের সন্ধান মিলেছে। এর মধ্যে দুটি সঞ্চয়ী হিসাবে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। লীলাবালির সঞ্চয়ী হিসাব গত বছরের ২০ আগস্ট বন্ধ করা হয়। তার আগ পর্যন্ত এতে প্রায় ৫৭ কোটি টাকা জমা ও পরে তুলে নেওয়া হয়। সাফা জেনারেল ট্রেডিংয়ের সঞ্চয়ী হিসাবে প্রায় ১৫ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। আর প্রতিষ্ঠানটির চলতি হিসাবে জমার চেয়ে উত্তোলন বেশি হয়েছে। ফলে জব্দের আগে এই হিসাবে ২৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকার নেগেটিভ স্থিতি ছিল।

দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তারা জানান, পাপুল পরিবারের কাছে দিনে নগদ টাকা এতটাই এসেছে যে, তা ব্যাংকে রাখতে একই নামে দিনে শতাধিক এফডিআর হিসাব খুলতে হয়েছে। এর মধ্যে সেলিনার নামে ২০১৭ সালের ৬ মার্চ এক দিনে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের হাতিরপুল শাখায় এক বছর মেয়াদি ১১৯টি এফডিআর করা হয়। এতে মোট ৭ কোটি ১৪ লাখ রাখা হয়।

কুয়েতের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে পাপুলের নামে জমা থাকা প্রায় ১৩৮ কোটি টাকা জব্দ করেছে দেশটির সরকার। ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ ওঠায় এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের পরিচালক পদ থেকে তাকে অব্যাহতি  দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকটিতে পাপুলের নামে ২ কোটি ২১ লাখ টাকার শেয়ার রয়েছে। স্ত্রীর নামেও এই ব্যাংকে ১ কোটি ৯ লাখ টাকার শেয়ার রয়েছে। সবমিলে ব্যাংকটিতে এ দম্পতির বিনিয়োগ প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। দুদক গত ১৭ জুন পাপুল, সেলিনা, কাজী ওয়াফা ও জেসমিনের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেয়। আর পাপুল ঘনিষ্ঠ লক্ষ্মীপুরের জামশেদ কবীর বাকি বিল্লাহ, নুরউদ্দিন চৌধুরী নয়ন, সালাহউদ্দিন টিপু ও আরিফের সম্পদের হিসাব নিতে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়েছেন।

কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অর্থ পাচারসহ পাপুল দম্পতির বিরুদ্ধে অভিযোগের সংখ্যা এত বেশি যে, তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করা হতে পারে।’

রাজনীতি/কামাল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here