মেয়রের আশ্বাসে অনশন ভাঙলেন রায়হানের মা

পুলিশ ফাঁড়ির সামনে রায়হানের মা সালমা বেগমসহ তার পরিবারের সদস্যরা ।

নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট: পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনে মারা যাওয়া রায়হান আহমদের মায়ের অনশন ভাঙিয়েছেন সিলেট সিটি করপোরেশেনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। ছেলের হত্যাকারীদের বিচার ও কঠোর শাস্তির দাবিতে কাফনের কাপড় বেঁধে আমরণ অনশনে বসেছিলেন রায়হানের মা সালমা বেগম।

অনশনে বসার ছয় ঘণ্টা পর রোববার বিকেল ৫টায় সালমা বেগমকে শরবত খাইয়ে অনশন ভাঙান মেয়র। তার সঙ্গে সিলেট সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর ও নাগরিক আন্দোলনের নেতা আব্দুল করিম কিম উপস্থিত ছিলেন।

মেয়র আরিফ রায়হানের মা সালমা বেগমকে আশ্বাস দিয়ে বলেন, রায়হান হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলবো। তারপরও অভিযুক্তরা গ্রেফতার না হলে সিলেটবাসীকে সাথে নিয়ে আমরা বৃহত্তর আন্দোলনে নামবো।

মেয়র বলেন, পুলিশের নির্যাতনে রায়হান হত্যার ঘটনায় সাধারণ মানুষের বিবেকে নাড়া দিয়েছে। মানুষ মনের কষ্ট থেকে আন্দোলনে নেমেছেন। নগরবাসীর এই আন্দোলন সংগ্রামকে আমি সম্মান জানাই।

মেয়রের আশ্বাসে অনশন ভাঙার পর রায়হানের মা সালমা বেগম বলেন, আমি আর আশ্বাস শুনতে চাই না। এখন উদ্যোগ দেখতে চাই। অভিযুক্তদের সবাইকে গ্রেফতার করা হয়েছে এ কথা শুনতে চাই।

তিনি বলেন, এসআই আকবরের নির্মম নির্যাতনে আমার ছেলে আজ কবরে আর এসআই আকবরসহ আসামিরা এখনো জেলের বাইরে এটা মেনে নেয়া যায় না।

রোববার বেলা ১১টায় বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির সামনে রায়হানের মা সালমা বেগমসহ তার পরিবারের সদস্যরা অনশন শুরু করেন। অনশনে সংহতি জানিয়ে অনেকেই অংশ নেন। বিকেলে পুলিশ ফাঁড়ির সামনে সড়ক অবরোধ করেন বিক্ষুব্ধ জনতা। তারা বিভিন্ন দাবি জানিয়ে স্লোগান দেন।

এদিকে রায়হান আহমদের বিরুদ্ধে ছিনতাইয়ের অভিযোগ তোলা যুবক সাইদুর রহমানকে আটক করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। রোববার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে তাকে আটক করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ অক্টোবর মধ্যরাতে রাতে সাইদুর রহমান বন্দরবাজার এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে থাকা কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে জানান তিনি কাষ্টঘর এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন। তার অভিযোগ পেয়ে রাত আড়াইটার দিকে কাষ্টঘর থেকে রায়হানকে তুলে নিয়ে আসে পুলিশ। এরপর এই ফাঁড়িতে তাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করেন থানার ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ অপর পুলিশ সদস্যরা।

পরদিন (১১ অক্টোবর) সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে রায়হানের মৃত্যু হয়। রায়হান সিলেট নগরের আখালিয়ার নেহারিপাড়ার সাবেক বিডিআর সদস্য মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে। তিনি নগরের রিকাবীবাজার স্টেডিয়াম মার্কেটে এক চিকিৎসকের চেম্বারে চাকরি করতেন।

এ ঘটনায় ১২ অক্টোবর রাতে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে কোতওয়ালী মডেল থানায় একটি মামলা করেন রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি। ১৪ অক্টোবর মামলাটি পুলিশ সদরদফতরের নির্দেশ পিবিআইতে স্থানান্তর হয়। তদন্তভার পাওয়ার পর পিবিআইয়ের টিম ঘটনাস্থল বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ি, নগরের কাষ্টঘর, নিহতের বাড়ি পরিদর্শন করে। সর্বোপরি মরদেহ কবর থেকে তোলার পর পুনরায় ময়নাতদন্ত করা হয়।

রায়হানের মরদেহে ১১১টি আঘাতের চিহ্ন উঠে এসেছে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে। এসব আঘাতের ৯৭টি ফোলা আঘাত ও ১৪টি ছিল গুরুতর জখমের চিহ্ন। অসংখ্য আঘাতের কারণে হাইপোভলিউমিক শক ও নিউরোজেনিক শকে মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, কিডনিসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো কর্মক্ষমতা হারানোর কারণে রায়হানের মৃত্যু হয়।

ঘটনার দিন বিকেলে মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলে রায়হানকে ফাঁড়িতে এনে নির্যাতনের প্রাথমিক প্রমাণ পায় কমিটি। এই তদন্ত কমিটির সুপারিশে বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া, কনস্টেবল হারুনুর রশিদ, তৌহিদ মিয়া ও টিটু চন্দ্র দাসকে সাময়িক বরখাস্ত এবং এএসআই আশেক এলাহী, এএসআই কুতুব আলী ও কনস্টেবল সজীব হোসেনকে প্রত্যাহার করে তাদের পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়।

এছাড়া গত ২১ অক্টোবর এ ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (সাময়িক বরখাস্তকৃত) এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে ফাঁড়ি থেকে পালাতে সহায়তা করা ও তথ্য গোপনের অপরাধে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির টু আইসি এসআই হাসান উদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

রাজনীতি/কাসেম/ফয়সাল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here