যে কন্ঠ নিয়ম ভেঙেছিলো

জেড, আর সুমনঃ ১. তার কণ্ঠে যুগের পর যুগ মুগ্ধ হয়ে আছে শ্রোতারা। কয়েক দশক ধরে খ্যাতির চূড়ায় অবস্থান করছেন তিনি। পাঁচ দশকের বেশি সংগীতজীবনে তিনি গেয়েছেন ১৮ ভাষায় গান। বাংলা দেশের সঙ্গীতকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেছেন সগৌরবে । হয়েছেন কিংবদন্তি । তিনি রুনা লায়লা। পাঁচ দশকের বেশি সংগীতজীবনে তিনি গেয়েছেন ১৮ ভাষায় গান। বাংলা দেশের সঙ্গীতকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেছেন সগৌরবে।


আজ এই কিংবদন্তির ৬৮তম জন্মদিন। ১৯৫২ সালের ১৭ নভেম্বর সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন এই গায়িকা।

২. প্রায় ৩০ বছর আগের কথা ।
আমি তখন টো টো কোম্পানীর ম্যানেজার ।
মানে কোন কাজ কাম নাই , শুধু ঘুরে বেড়াই । মাঝে মধ্যে কাঠের শ্লেটে অ ,আ , ক , খ অথবা ১, ২ এর উপর হাত ঘুরাই । আর সপ্তাহে একবার বাজার থেকে ক্রিসতেল (কেরসিন) কিনে আনি।


এলাকায় বিদ্যুৎ কালো নিমের মাজন পৌঁছালেও , লাইট-ফ্যান চালানোর বিদ্যুৎ (কারেন্ট) তখনো পৌছায় নি।

সন্ধ্যার পর ১/২ ঘন্টা কেরসিনের কুপি জ্বালিয়ে যে যত দ্রুত পারতো ঘুমিয়ে পরতো । মোট কথা সন্ধ্যা নামার ২ ঘন্টার মধ্যে পুরো গ্রাম গভীর ঘুমে চলে যেত।

যারা একটু অভিজাত, তাদের ঘরে থাকতো হারিকেন। আমার বাসায় পাইলট এবং তাজ এই দুই কোম্পানীর দুটি হারিকেন ছিলো । একটি কালো রংয়ের , অন্যটি সবুজ ।

অজপাড়াগায়ের এই ছেলেটা তখন গান বাজনার সাথে পরিচিত হয় নি । এলাকার বড় ভাইয়ের অনেক দূরে দূরে গিয়ে যাত্রা দেখতো । তাদের মুখে শুনে ২/১ গানের সাথে সবে মাত্র পরিচিত হয়েছি । কিন্তু মনে ধরে নি।

এরমধ্যে একদিন বড় মামা ঢাকা থেকে একটি টেপ(ক্যাসেট প্লেয়ার) নিয়ে হাজির হলেন । সাথে ৩টা ক্যাসেট । মামা বুঝালেন ক্যাসেটের ফিতার মধ্যে গান থাকে । আমার কাছে এটা তখন পৃথিবীর সবচেয়ে বিষ্ময়কর বস্তু । আমি হাতে নিয়ে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছি সেই ক্যাসেট । ফিতার মধ্যে কি করে গান থাকে আমার মাথায় ঢোকে না।

যেহেতু কারেন্ট নেই , সেহেতু এই টেপ চালানো যাচ্ছে না । আমি মামাকে বললাম ,

  • মামা , ঘরে কেরসিন তেল আছে , এটা দিয়ে চলবে ?
  • ধুর! বোকা , কেরসিন দিয়ে কি আর কারেন্টের জিনিস চালানো যায়! ব্যাটরী লাগবে , ব্যাটারী । চল বাজারে ।

বাজারে গিয়ে ৪টা ব্যাটারি কিনে আনা হলো। সব রেডি । চালানো হলো টেপ । বেজে উঠলো ‌‌”বন্ধু তিন দিন তোর বাড়ি গেলাম দেখা পাইলাম না”।

সন্ধ্যার পর যে গ্রাম ঘুমিয়ে পরতো , সেই গ্রাম এখন রাত ১০ টা পর্যন্ত সরব। আমাদের বাড়িতে মানুষের ভীড়। জন্মের পর থেকে দেখে আসা নিয়ম ভেঙে দিলো একটি কন্ঠ। সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শোনে সেই কন্ঠের গান।

”বন্ধু তিন দিন তোর বাড়ি গেলাম দেখা পাইলাম না”।
কিন্তু আমি গাই, “বন্ধু টিন টিন তোর বাড়ি গেলাম , দেখা পাইলাম না “ ।


হোক ভুল , কিন্তু গানের প্রতি আমার প্রেম এই গান থেকেই এসেছে । সেই কন্ঠ থেকে এসেছে। আর এই কন্ঠের অধিকারী উপ মহাদেশের কিংবদন্তি কন্ঠ শিল্পী রুনা লায়লা ।

আমার মত হাজারো মানুষ তার কন্ঠে গান শুনে বাংলা গানের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছ।

ছবিতে বামে মেয়ে কন্ঠশিল্পী আখিঁ আলামগীর, মাঝে কিংবদন্তি কন্ঠশিল্পী রুনা লায়লা, ডানে স্বামী চিত্রনায়ক আলমগীর।


৩. বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে গানের ভুবনে যাত্রা শুরু করেন রুনা লায়লা। পাঁচ দশকের সংগীতজীবনে লোকজ, পপ, রক, গজল, আধুনিক—সব ধাঁচেই কৃতিত্ব দেখিয়েছেন রুনা। বাংলার পাশাপাশি হিন্দি, উর্দু, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, গুজরাটি, বালুচ, অ্যারাবিক, ফারসি, মালয়, নেপালিজ, জাপানিজ, ইতালিয়ান, স্প্যানিশ, ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজি ভাষার গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। বলা হয়, প্রায় ১৮টি ভাষায় গাইতে জানেন গুণী এই সংগীত শিল্পী।

বাংলাদেশের সিনেমায় ‘গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে’ রুনা লায়লার গাওয়া প্রথম সিনেমার গান। গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা ও সুবল দাসের সুরে এই গানে কন্ঠ দেন তিনি। । ‘দ্য রেইন’ (১৯৭৬), ‘যাদুর বাঁশী’(১৯৭৭), ‘অ্যাকসিডেন্ট’(১৯৮৯), ‘অন্তরে অন্তরে’ (১৯৯৪), ‘তুমি আসবে বলে’ (২০১২) এবং ‘দেবদাস’ (২০১৩)। এই ছবিগুলোতে প্লেব্যাক করার জন্য পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

সংগীত অসামান্য অবদানের জন্য স্বাধীনতা পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (একাধিকবার), দাদা সাহেব ফালকে সম্মাননাসহ দেশ-বিদেশের বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন উপমহাদেশের খ্যাতনামা এই সংগীতশিল্পী।

আজ এই কিংবদন্তির জন্মদিন । শুভ জন্মদিন । বাংলা গানের জ্বলজ্বলে তারা । আপনি দেখিয়েছেন তারারা কি ভাবে আলো ছড়ায় আর সেই আলোতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম কিভাবে পথ চলে। শ্রদ্ধা ।

রাজনীতি/কামরুল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here