শারীরিক এতেকাফের সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক এতেকাফও জরুরি

মওলানা ওয়াহিদুদ্দিন খান, অনুবাদ: মহিউদ্দিন মণ্ডল

বৃহস্পতিবার, ২৮ এপ্রিল ২০২২, বিকাল ০৬:০৬


রমজান মাস সিয়াম সাধনার মাস। মুসলমানরা রমজান মাসের প্রত্যেকদিন রোজা রাখে। একই সঙ্গে রমজান মাস এতেকাফের মাস। 

 

এতেকাফ দুই প্রকারের, শারীরিক এতেকাফ এবং মানসিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক এতেকাফ। শারীরিক এতেকাফে ব্যক্তি নিজেকে আলাদা করে মসজিদে এতেকাফ (অবস্থান) করে, যাতে সে অধিকতর একত্বের সঙ্গে ইবাদত করতে পারে এবং যতটা সম্ভব কুরআন তেলাওয়াত করতে পারে। এটি রমজান মাসে মসজিদের ভেতরে থেকে করা হয়। 

এই এতেকাফটি কুরআনের সূরা বাকারায় নিম্নোক্ত শব্দে উল্লেখ করা হয়েছে:  وانتم عاکفون فی المساجد অর্থাৎ আপনি যখন এতেকাফ অবস্থায় থাকবেন (২: ১৮৭)।

একই সঙ্গে এতেকাফের আরেকটি রূপ রয়েছে যাকে বুদ্ধিবৃত্তিক এতেকাফ বলা যেতে পারে।  বুদ্ধিবৃত্তিক এতেকাফের অর্থ হলো সৃষ্টির মধ্যে চিন্তা-ভাবনা করে স্রষ্টাকে উপলব্ধি করা। 

শারীরিক এতেকাফ, মাত্র কয়েক দিন স্থায়ী হয়। কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক এতেকাফ সারা জীবন চলতে থাকে। এই এতেকাফ সব সময় এবং সর্বত্র চলতে থাকে। এই এতেকাফে মানুষ তার অধিকাংশ সময় চিন্তা-চেতনায় কাটায়। তিনি ধর্মের বিষয়ে ধ্যান করেন এবং তার চারপাশের বিশ্ব থেকে ধর্মীয় পাঠ শিখতে চান। তিনি যথাসম্ভব আধ্যাত্মিক এতেকাফে নিযুক্ত হন।

কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে এই বুদ্ধিবৃত্তিক এতেকাফের উল্লেখ আছে। উদাহরণস্বরূপ, এই আয়াতগুলো দেখুন: আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে বুদ্ধিমান লোকদের জন্য নিদর্শন রয়েছে, যারা দাঁড়িয়ে ও বসে এবং শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে, এবং  আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে চিন্তাভাবনা করে। তারা বলে: ‘হে আমাদের পালনকর্তা, আপনি এসব উদ্দেশ্যহীনভাবে করেননি, আপনি পবিত্র, অতএব আমাদেরকে আগুনের আজাব থেকে রক্ষা করুন’ (সুরা আলে ইমরান : ১৯০-৯১)।

এক বর্ণনায় এসেছে, নবী (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যারা এই আয়াত তেলাওয়াত করে তারা যেন এতে চিন্তাভাবনা করে। (আল মুয়াজ্জিমুল আকবর আত তিবরানি, ১২৩২২)। 

তদ্রুপ অন্যত্র নবী (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, আফসোস সেই ব্যক্তির জন্য যে এই আয়াতগুলো পড়ে কিন্তু সেগুলোর প্রতি চিন্তাভাবনা করে না। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং. ৬২০)

রাসুলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্পর্কে বলা হয়েছে:  : کان رسول اللہ صلی اللہ علیہ وسلم متواصل الاحزان، دائم الفکرۃ  অর্থাৎ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিকাংশ সময় গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকতেন। এটাই বুদ্ধিবৃত্তিক এতেকাফ, অর্থাৎ নীরবে চিন্তা করা। (আশ শামাইল লিত-তিরমিজি, হাদিস নম্বর ২১৫)

মসজিদের এতেকাফ হলো সর্বনিম্ন দশ দিনের এতেকাফ। বিপরীতে, মানসিক এতেকাফ হলো সর্বাধিক এতেকাফ। এটি এমন একটি এতেকাফ যা সারাজীবন স্থায়ী হয়। এই মানসিক এতেকাফ সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে প্রচলিত ছিল। কিছু সাহাবীর ক্ষেত্রেও তার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। 

যেমন হজরত আবুদ দারদা আনসারির ইন্তেকালের পর তার স্ত্রী উম্মে আদ দারদাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল আবুদ দারদার বিশেষ এবাদত কি ছিল? উম্মে আদ দারদা উত্তর দিলেন, চিন্তা ও বিশ্বাস (হালিয়াতুল আউলিয়া, ভলিউম ১, পৃষ্ঠা ২০৮) অর্থাৎ ধ্যান করা এবং উপদেশ গ্রহণ করা।

এই বুদ্ধিবৃত্তিক এতেকাফ সম্বন্ধে কুরআনে এ ধরনের শব্দ এসেছে— চিন্তা, মনন, স্মরণ, স্মরণ ও যুক্তি ইত্যাদি। এর অর্থ সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করা। চিন্তার এই প্রক্রিয়াটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চিন্তার প্রক্রিয়া সমস্ত উচ্চ গুণাবলীর জন্ম দেয়। যেমন, প্রজ্ঞা, জ্ঞান, মানসিক বিবর্তন, বিশ্বাস, গভীর অর্থের আবিষ্কার ইত্যাদি।

এই বুদ্ধিবৃত্তিক এতেকাফ একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি পূর্বশর্ত আছে. আর তা হলো নিজেকে সব ধরনের বিভ্রান্তি (distraction) থেকে রক্ষা করা। এছাড়া বুদ্ধিবৃত্তিক এতেকাফ কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। 

বাস্তবতা হল মানসিক এতেকাফ একটি অবিরাম চিন্তা প্রক্রিয়ার নাম। এই চিন্তা প্রক্রিয়া থেকে মানুষ,  কুরআনের ভাষায়, ঈমানের গভীরতা লাভ করে। চিন্তার প্রক্রিয়া নেই তো ঈমানের গভীরতাও নেই।

পরিভাষাগতভাবে, মসজিদে এতেকাফ করা হয়। কিন্তু একজন ব্যক্তি যখন উপবাসের জীবন যাপন করেন, তখন তিনি স্বভাবতই ঐশ্বরিক চিন্তায় মগ্ন থাকেন। তিনি আসমান ও পৃথিবীর নিদর্শনগুলির উপর ধ্যান করেন, তিনি পরকাল সম্পর্কিত বিষয়গুলির উপর ধ্যান করেন। এটি মানসিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক এতেকাফ।

এতেকাফের এই দ্বিতীয় রূপটি যদিও ধর্মীয় নিয়মানুযায়ী রোজার অংশ নয়, তবে নিঃসন্দেহে এটি রোজাদারের জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ, অর্থাৎ আল্লাহকেন্দ্রিক জীবন। 

যখন একজন ব্যক্তি রমজান মাসে যখন রোজারত অবস্থায় থাকেন, তখন তার মনে এই বিষয়ে প্রতিনিয়ত আলোড়ন সৃষ্টি হয়। যদি প্রচলিত রোজাটি তার রোজার একটি বৈধ অংশ হয়, তবে এই দ্বিতীয় রোজাটি তার রোজার স্বাভাবিক অংশ হয়ে যায়। একটির গুরুত্ব আনুষ্ঠানিক হলে অপরটির গুরুত্ব অনানুষ্ঠানিক।

এমএসি/আরএইচ

Link copied