নামের পার্থক্য থাকলেও, আ.লীগ-বিএনপির চরিত্র এক: গোলাম পরওয়ার
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, বিকাল ০৫:৪০
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে দলের নামের পার্থক্য, চরিত্র সব এক। শুধু দলটার নাম পরিবর্তন হয়েছে বাকি সব চরিত্র এক। তিনি বলেন, চাঁদাবাজি, খুন, দখলদারি, হাট কমিটি, বাজার কমিটি, স্কুল কমিটি, বালুঘাট, টেম্পু স্ট্যান্ড, বাসস্ট্যান্ড যা আগে চলত, এখনো ঠিকই চলছে তবে নামটা শুধু উল্টে গেছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) দলটির ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের উদ্যোগে আয়োজিত জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম হলে ‘রক্তে ভেজা ২৮ অক্টোবর, ফ্যাসিবাদের উত্থান: কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ বিনির্মাণের চ্যালেঞ্জ করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের জন্য মামলা করা হলো। কিন্তু ২০০৯ সালের হাসিনা সরকার সেই মামলা এমনভাবে প্রত্যাহার করে নিল সেই সাথে মামলার নথিপত্র নিখোঁজ করে দিল। আজকে সেই শহীদের মায়েরা বিচারের জন্য কাঁদে।’
মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, ‘বিএনপি ও আওয়ামী লীগের কাছে শিখেছে ক্ষমতায় না থাকলে গণতন্ত্র, ক্ষমতায় গেলে কীভাবে ফ্যাসিবাদের পথ ধরতে হয়। বিএনপি এখন সে পথেই হাঁটছে। তারেক রহমান নিজে নির্বাচনের আগে গণভোটের পক্ষে হ্যাঁ ভোট চেয়েছেন। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে নিজের দেওয়া হ্যাঁ ভোটের সাথে গাদ্দারী করার এমন নজির পৃথিবীর কোথাও নেই। এর মধ্য দিয়ে তিনি সেই ফ্যাসিবাদের পথই ধরলেন। সহস্রাধিক মানুষের জীবন গেলো। তাদের রক্তের সাথে বেইমানি করে নতুন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন এভাবে ভেঙে দেবেন? একই দিনে দুটি ভোট হলো একটি মানলেন আরেকটি মানলেন না। কারণ একটা মানলে প্রধানমন্ত্রী হওয়া যায় রাষ্ট্রপতি হওয়া যায়। এত বড় বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে, তাদের মত না নিয়ে, সংস্কারের বাদ দিয়ে সংবিধান সংশোধনের পথে গিয়েছেন। এটাই হচ্ছে ফ্যাসিবাদের পথ। গণতন্ত্রের ধ্বজাধারীরা ক্ষমতায় আসার পর সেই গণতন্ত্রের কথা আবার ভুলে যায়।’
বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর জোট সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরের দিন বিএনপির কাছে জোটের একসাথে সমাবেশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা সে প্রস্তাব না মেনে আলাদা আলাদা সমাবেশ করার পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়।’
তিনি বলেন, ‘আমরা জানি না, সেদিন গণতন্ত্র হত্যাকারী ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে আঁতাত করে ইসলামী আন্দোলনকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে তারা জড়িত ছিল কিনা। তানা হলে উত্তর গেটে হামলা হলো আর নয়াপল্টনে নির্বিঘ্নে সমাবেশ হলো কীভাবে? অনেকে এ বিষয়টি জামায়াতের কাছে জানতে চায় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।’
একটা সমাবেশে সাপের মতো মানুষকে পিটিয়ে পিটিয়ে লাশের উপর নৃত্য করা হলো আর আরেকটি সমাবেশ শান্তিপূর্ণভাবে হয়ে গেলো। সেদিনও কোনো নতুন সরকার গঠিত হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশ, র্যাব, বিডিআর সেনাবাহিনী সবকিছু ছিল। সকাল থেকে লড়াই চলল, যুদ্ধ চলল সরকারের একজন মন্ত্রীর কর্মসূচিতে এমন নির্মম ঘটনা ঘটলো অথচ তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, কেন সেদিন যাদের হাতে ক্ষমতা ছিল নিষ্ঠুর বর্বরতা রুখে দেওয়ার জন্য তারা ভূমিকা রাখেনি?
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের ইতিহাস হচ্ছে ফ্যাসিবাদের ইতিহাস। তারা ক্ষমতার বাইরে থাকলে গণতন্ত্রের কথা বলে আর যখন ক্ষমতার যায় তখনই গণতন্ত্র হত্যা করে। শেখ মুজিব তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন, জেল খেটেছেন। পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি বাঙালি তার ডাকে সাড়া দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু তিনি ক্ষমতায় এসে গণতন্ত্রের টুঁটি চেপে ধরে হত্যা করলেন। সমস্ত রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে বাকশাল কায়েম করলেন। সব দল নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি তিনি তার নিজের দলকেও নিঃশেষ করলে। সরকারের পছন্দের চারটি পত্রিকা চালু রেখে সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়। ট্রেড ইউনিয়নগুলো বন্ধ করা হয়। এর মধ্য দিয়েই ফ্যাসিবাদের সূচনা করে শেখ মুজিব। তার কন্যা শেখ হাসিনাও ক্ষমতার আগে গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে চিৎকার করেছেন। আর ক্ষমতায় গিয়ে গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, চার দলীয় জোটের ক্ষমতা হস্তান্তরের গণতান্ত্রিক পদ্ধতি আওয়ামী লীগের পছন্দ হয়নি। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর জোট সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় বিএনপি নয়াপল্টনে এবং জামায়াত বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সমাবেশ আহ্বান করে। সেদিন শেখ হাসিনা তার নেতা কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছে লগি- বৈঠা নিয়ে মাঠে নামতে। কতটা গণতন্ত্র বিরোধী হলে, ক্ষিপ্র হলে, সন্ত্রাসী হলে, বর্বর হলে লগি-বৈঠা, অস্ত্রশস্ত্রসহ ঝাঁপিয়ে পড়ার এমন নির্দেশ দিতে পারে।
তিনি বর্তমান সরকারের উদ্দেশে বলেন, ‘যদি আপনারা আওয়ামী লীগকে সত্যিই খুনি ফ্যাসিবাদী চরিত্র বলে মনে করে থাকেন, তাহলে ২৮ অক্টোবরের মামলা পুনরুজ্জীবিত করে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করুন।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপি ও আওয়ামী লীগের আচরণে কোনো পার্থক্য নেই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যতটুকু সংস্কার করেছে বিএনপি এসে ততটুকু মুছে দিয়েছে। তারা ক্ষমতায় এসে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার পথ রুদ্ধ করেছে। বিচারের মুখোমুখি হলে বিচারকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যই একাজ করেছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সবগুলোকে ধ্বংস করেছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করেছিল, দুর্নীতি দমন কমিশন ধ্বংস করেছিল, মানবাধিকার কমিশন সহ সবকিছুকে আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিল। আজকের বিএনপি এই সংক্রান্ত সকল অধ্যাদেশ সংসদে এসে সংখ্যাগরিষ্ঠতার গায়ের জোরে বাতিল করে দিয়েছে। এজন্যই পুরোনো ফ্যাসিবাদ আর নব্য ফ্যাসিবাদের কারেক্টারের কোনো পরিবর্তন নেই।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি ড. আব্দুল মান্নান প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের মজলিসে শূরা সদস্য ও সহকারী প্রচার সম্পাদক আবদুস সাত্তার সুমনের সঞ্চালনায় সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামিক কেন্দ্রীয় মজলিসের শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি কামাল হোসেন এমপি, ডাকসু ভিপি আবু সাদিক কায়েম, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির, ২৮ অক্টোবর ২০০৬ এর শহিদ সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুমের গর্বিত মা শামসুন্নাহার রুবি, শহীদ হাফেজ গোলাম কিবরিয়া শিপনের পিতা তাজুল ইসলাম, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহিদুল ইসলাম, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি আব্দুস সালাম প্রমুখ। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- ঢাকা ৪ আসনের সংসদ সদস্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন, অ্যাডভোকেট এসএম কামাল উদ্দিন প্রমুখ।
এমএসি/আরএইচ