নিরাপদ এআই ব্যবহারের বার্তা নিয়ে শুরু হলো বিআইজিএফ সম্মেলন
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, রাত ১০:১৩
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে ইন্টারনেট গভর্ন্যান্সের নতুন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হয়েছে ২১তম বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরাম-২০২৬।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর আগারগাঁওস্থ বিটিআরসি ভবনে ফোরামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী (অব.)।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) ও বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরামের (বিআইজিএফ) যৌথ উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী আয়োজিত সেমিনারে মোট ১২টি অধিবেশনে নীতিনির্ধারক, টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, প্রযুক্তিবিদ, উদ্যোক্তা এবং শিক্ষার্র্থীসহ দুই শতাধিক প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করবেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী (অব.) বলেন, শুরুতে বাংলাদেশে কানেক্টিভিটি বা ভয়েস সংযোগ নিশ্চিত করা ছিল প্রধান লক্ষ্য। সময়ের পরিক্রমায় ভয়েস থেকে ডাটা পেরিয়ে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুগে প্রবেশ করেছি। এআই একটি প্রযুক্তিগত উপাদান বা ইঞ্জিন নয়; এর সফল বাস্তবায়নের জন্য আমাদের পুরো সিস্টেম, কর্মপ্রবাহ এবং শাসন কাঠামোর আমূল পর্যালোচনা ও পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন।
গত তিন দশকে বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের নেটওয়ার্ক ও অবকাঠামো তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হলেও সেই অবকাঠামো কার্যকরভাবে ব্যবহার করে মানুষকে অনলাইনে যুক্ত করা এবং ইন্টারনেট ব্যবহারে সক্ষম করে তোলা বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি আরও বলেন, পৃথিবীতে প্রায় সাড়ে সাত হাজার ভাষা রয়েছে যার মধ্যে বাংলা বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম ভাষা। কিন্তু ইন্টারনেটে বাংলা ভাষার উপস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, ওয়েবসাইটের মোট কনটেন্টের মধ্যে বাংলা ভাষার অংশ প্রায় ০.১ শতাংশ ।ইন্টারনেটে বাংলা ভাষার কনটেন্টের স্বল্পতা দূর করতে আরও বেশি মানসম্মত বাংলা কনটেন্ট, ডিজিটাল সেবা ও এআইভিত্তিক অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী নিজেদের শিক্ষা, পেশা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইন্টারনেট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারলেই অর্থবহ সংযোগ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।
বিটিআরসির সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ খলিল উর রহমান (অব.) জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, সংবেদনশীল তথ্য ও অত্যাবশ্যকীয় সেবা সুরক্ষায় জাতীয় সাইবার নিরাপত্তার ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কৌশলের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনা মোকাবিলা ও সমন্বয়, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, আইনগত ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো, দক্ষ জনবল উন্নয়ন ও শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ডিপফেক ও স্বয়ংক্রিয় ফিশিংসহ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর সাইবার হুমকির বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি।
সিঙ্গাপুর থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে এশিয়া প্যাসিফিক নেটওয়ার্ক ইনফরমেশন সেন্টারের সিনিয়র অ্যাডভাইজার জয়েস চেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব তুলে ধরে অনলাইন নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও পরিবেশগত স্থায়িত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার ও বিভিন্ন অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন।
সুইজারল্যান্ডের জেনেভা থেকে অনলাইনে যুক্ত হয়ে জাতিসংঘ ইন্টারনেট গভান্সের্স ফোরাম সেক্রেটারিয়েট এর ডিজিটাল পলিসি অ্যান্ড রেগুলেশন বিশেষজ্ঞ আনজা গেঙ্গো শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সাইবার বুলিং প্রতিরোধ এবং ডিজিটাল পরিসরে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ ড. মঞ্জুর-ই-খোদা তরফদার অনলাইন প্রতারণা, তরুণদের ওপর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সামাজিক প্রভাব এবং শহর ও গ্রামের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের বৈষম্য নিয়ে আলোচনা করেন। ডিজিটাল রূপান্তরের সুফল সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।
স্বাগত বক্তব্যে জাতিসংঘের তথ্য সমাজ বিষয়ক গ্রুপের মাল্টি-স্টেকহোল্ডার কনসালটেশন গ্রুপ সদস্য এ. এইচ. এম. বজলুর রহমান নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবকেন্দ্রিক ডিজিটাল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, কার্যকর ইন্টারনেট গভর্ন্যান্সের ক্ষেত্রে মানবাধিকার সমুন্নত রাখা, নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেয়া জরুরি।
আগামী ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত চলমান এ ফোরামে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতি, ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো, ডেটা গভর্ন্যান্স, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি, টেকসই উন্নয়ন এবং ডিজিটাল গণতন্ত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। সরকার, শিল্পখাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ ও সহনশীল ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তোলাই এ আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।
এমএসি/আরএইচ