মাতারবাড়ী প্রকল্প ঘিরে জাপানের পরিকল্পনা, মুখ খুলল ভারত
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, রাত ০৩:৩৩
বাংলাদেশের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক শিল্প ও যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার জাপানি পরিকল্পনায় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের ভূখণ্ড ও বন্দর ব্যবহার করে ভারতের সেভেন সিস্টার্সকে বঙ্গোপসাগর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনার মধ্যে এ অঞ্চলে জাপানের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, উত্তর-পূর্ব ভারতকে ঘিরে জাপানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ ও কৌশলগত সংযোগ আরও জোরদার করতে কাজ করছে দুই দেশ।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, জাপানের সঙ্গে ভারতের শক্তিশালী কৌশলগত অংশীদারত্ব রয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারত ও জাপানকে যুক্ত করে বেশ কিছু যৌথ উদ্যোগ চালু রয়েছে। এসব উদ্যোগের আওতায় কৌশলগত সংযোগ আরও শক্তিশালী করার কাজ চলছে।
তিনি বলেন, ‘জাপানের সঙ্গে আমাদের দৃঢ় অংশীদারত্ব রয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারত ও জাপানকে অন্তর্ভুক্ত করে বেশ কিছু যৌথ উদ্যোগও চালু রয়েছে। এই কৌশলগত সংযোগগুলো আরও শক্তিশালী করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’
জয়সওয়াল আরও জানান, উত্তর-পূর্ব ভারতের স্থানীয় বাসিন্দাদের জাপানি ভাষা শেখার জন্য উৎসাহিত করছে ভারত সরকার। এর মাধ্যমে দুই দেশের মানুষের জন্য কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। তার মতে, ভারত-জাপান অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অংশীদারত্বের পরিধি ক্রমেই বাড়ছে এবং এ সহযোগিতায় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
ভারতের এ বক্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন বাংলাদেশের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু গত ১৮ অক্টোবর জাপানের কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানায়, মাতারবাড়ীকে ঘিরে একটি ‘শিল্পমূল্য শৃঙ্খল’ গড়ে তুলতে চায় টোকিও। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও বাণিজ্য বাড়ানোর সম্ভাবনা দেখছে জাপান।
জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দ্য হিন্দুকে বলেছিলেন, মাতারবাড়ী বন্দর বাংলাদেশকে আঞ্চলিক শিল্পকেন্দ্রে পরিণত করার সম্ভাবনা রাখে। জাপানের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বন্দর, শিল্প ও বাণিজ্যিক অবকাঠামোকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, নেপাল ও মিয়ানমারের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগও দেখছে জাপান।
প্রকল্পটি ঘিরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরেও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে জাপানের আর্থিক সহায়তা চাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশের। সফরের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গত আগস্টে মাতারবাড়ী পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তাকে প্রকল্পের পরবর্তী ধাপ ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অবহিত করা হয়।
জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে এটি হবে বাংলাদেশের একমাত্র গভীর সমুদ্রবন্দর। বর্তমানে বড় জাহাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কার কলম্বো ও মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বন্দরের ওপর নির্ভর করতে হয়।
আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দরগুলোর সংযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এর আগে ফেনী নদীর ওপর মৈত্রী সেতু নির্মাণ করা হয়, যার মাধ্যমে ভারতের ত্রিপুরার সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা ছিল। সেতুটি চালু হলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ী বন্দরে পণ্য পরিবহনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে সেতুটি এখনো চালু হয়নি।
এদিকে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আঞ্চলিক শিল্প ও যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জাপানের পূর্ব অভিজ্ঞতাও রয়েছে। থাইল্যান্ডের ব্যাংকককে কেন্দ্র করে কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক করিডর উন্নয়নে অর্থায়ন ও অবকাঠামো পরিকল্পনায় সহায়তা দিয়েছে দেশটি। জাপানের কূটনৈতিক কর্মকর্তাদের মতে, মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করেও এ ধরনের মডেল বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
সূত্র: দ্য হিন্দু
এমএসি/আরএইচ